সুনামগঞ্জে মার্চের শেষ সপ্তাহের অস্বাভাবিক ভারী বর্ষণ ও চেরাপুঞ্জি থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল। উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে হাওরগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এই পানি নিষ্কাশন নিয়ে এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন উজানের ও ভাটির কৃষকরা। একদিকে ফসল রক্ষার আর্তনাদ, অন্যদিকে বাঁধ কাটা নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের উপক্রম—সব মিলিয়ে হাওরজুড়ে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছর জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান গোলায় তুলতে পারলে এর বাজারমূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু গত এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে ১ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি সরাসরি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। বিশেষ করে মিনি পাগনার হাওর, হালির হাওর, ছায়ার হাওর ও কানলার হাওরসহ অন্তত ১০টি বড় হাওরের ফসল এখন পানির নিচে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত বছর মার্চ মাসে সুনামগঞ্জে মাত্র ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল। অথচ এ বছর একই সময়ে বৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২০০ মিলিমিটার। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে এর চেয়েও বেশি বৃষ্টি হওয়ায় নদ-নদীগুলো দ্রুত কানায় কানায় ভরে উঠেছে, যা হাওরের পানি নিষ্কাশনকে অসম্ভব করে তুলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উজানের হাওরগুলোর কৃষকরা নিজেদের ফসল বাঁচাতে বাঁধ কেটে পানি নামিয়ে দিতে চাইছেন। এতে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছেন ভাটির কৃষকরা। তাদের দাবি, ওপরের পানি নামলে নিচের নিচু এলাকার জমিগুলো পুরোপুরি তলিয়ে যাবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম জানান, “ডাকুয়ার হাওরের ওপরের কৃষকরা জোর করে বাঁধ কাটতে চাচ্ছেন, কিন্তু নিচের অংশের কৃষকরা বাধা দিচ্ছেন। খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি সরছে না, ফলে উভয় পক্ষই এখন ক্ষতির মুখে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার এই পরিস্থিতির জন্য অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “বৃষ্টির পানি ধারণ করার মতো আধার নেই। নদ-নদী ও বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশিত হতে পারছে না। একমাত্র নদী ও খাল খননই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান।”
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ৩১ মার্চ জেলা প্রশাসন জরুরি সভা ডেকেছে। সুনামগঞ্জ পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ইতোমধ্যে কয়েকটি জায়গায় আংশিক বাঁধ কেটে পানি সরানোর কাজ চলছে। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক সতর্ক করে বলেছেন, আগামী ৬-৭ এপ্রিল পুনরায় ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। যদি সেই সময়ে আবারও বৃষ্টি হয়, তবে ফসলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে ৭১০টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) ফসল রক্ষা বাঁধের ঘাস লাগানোর কাজ করলেও, প্রকৃতির এই আকস্মিক আচরণে দিশেহারা জেলার কয়েক লাখ কৃষক। কৃষকদের দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে সেচ পাম্প ও বিকল্প উপায়ে পানি সরিয়ে তাদের একমাত্র সোনালী ফসল রক্ষা করা হোক।
