বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে ভারত এক অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও বিতর্কিত পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। যেসব সীমান্ত এলাকায় ভৌগোলিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা সম্ভব নয়, সেখানে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ হিসেবে কুমির ও বিষধর সাপ ব্যবহার করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে দেশটির সীমান্তরক্ষা বাহিনী (বিএসএফ)। এ তথ্য প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ মার্চ বিএসএফ সদর দপ্তর থেকে একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সীমান্ত ইউনিটগুলোকে নদী ও জলাভূমি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হিংস্র সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনায় এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়। এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার ইতোমধ্যে কাঁটাতারের বেড়ার আওতায় এসেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের প্রায় ৮৫০ কিলোমিটার এলাকা দুর্গম হওয়ায় সেখানে বেড়া নির্মাণ করা কঠিন। বিশেষ করে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার নদী ও জলাভূমি এলাকায় এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব বলে জানিয়েছে বিএসএফ। তাদের মতে, এসব ফাঁকা অংশ দিয়েই অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধের ঘটনা বেশি ঘটে।
এই পরিকল্পনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ‘বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রকৃতিকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর সম্ভাব্য সহিংসতা প্রয়োগের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষক অংশুমান চৌধুরী এবং অ্যাক্টিভিস্ট হর্ষ মান্দারের মতে, সাপ বা কুমির কখনো অনুপ্রবেশকারী আর সাধারণ নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না। এটি মূলত সীমান্ত সংলগ্ন বাঙালি মুসলিম এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে আতঙ্কিত করার একটি অপকৌশল। আইনি প্রক্রিয়ার বদলে প্রাণঘাতী প্রাণীদের মাধ্যমে মানুষকে দমনের এই চেষ্টা চরম নিষ্ঠুরতার বহিঃপ্রকাশ।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কুমির বা সাপগুলো যদি ওই অঞ্চলের স্থানীয় না হয়, তবে তারা দ্রুত মারা যাবে। অন্যদিকে, বন্যার সময় এই বিষধর সাপগুলো লোকালয়ে বা মাছ ধরার এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি চরমভাবে বাড়বে। এটি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকেও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন মেক্সিকো সীমান্তে একই ধরণের চিন্তা করেছিল বলে গুঞ্জন আছে, তবে আধুনিক বিশ্বে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্তে বন্যপ্রাণীকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের নজির নেই। ফ্লোরিডার ‘অ্যালিগেটর অ্যালকাট্রাজ’ ডিটেনশন সেন্টারটির কথা উল্লেখ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সীমান্ত সুরক্ষার নামে এমন পদ্ধতি গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
এছাড়া বিএসএফের অনেক কর্মকর্তাই ব্যক্তিগতভাবে এই পরিকল্পনার কার্যকরিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, তবে সদর দপ্তরের নির্দেশে বর্তমানে এর মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা চলছে।
সূত্রঃ আলজাজিরা
কুশল/সাএ
