জিমেইল অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) হিসাব থেকে টাকা আত্মসাৎ করত একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্র। পরে সেই অর্থ একাধিক ধাপে স্থানান্তর করে অনলাইন জুয়া, গরুর ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হতো। এমন একটি চক্রের মূলহোতা মোহাম্মদ ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম। তিনি বলেন, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রতারক চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়। পরে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে চক্রটির প্রধান মোহাম্মদ ইকবালসহ দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপ, চারটি মোবাইল ফোন, ১৮টি বিকাশ নিবন্ধিত সিম, আটটি ব্যাংকের চেক বই এবং তিনটি ব্যাংক কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব আলামত ব্যবহার করে চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাইবার প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ এপ্রিল বিকেলে সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা এলাকার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন নিজের দোকানে অবস্থানকালে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন। একপর্যায়ে ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুনরায় চালু করলে তিনি দেখতে পান, ফোন থেকে বিকাশ, নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকিং অ্যাপস উধাও হয়ে গেছে।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)–এর বিভিন্ন হিসাব থেকে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং বিকাশ ও নগদ নম্বরে স্থানান্তর হয়ে যায়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং পরে নিশ্চিত হন যে তিনি একটি সাইবার প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এ ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা তদন্ত শুরু করে। তদন্তে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে প্রতারক চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।
ডিবি পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, চক্রটির সদস্যরা প্রথমে ভুক্তভোগীদের জিমেইল এবং অন্যান্য অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নিত। এরপর সেই অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপগুলোতে প্রবেশ করে অর্থ স্থানান্তর করত। আত্মসাৎ করা অর্থ বিভিন্ন স্তরে ঘুরিয়ে লেনদেনের উৎস আড়াল করা হতো।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গেছে, প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ অনলাইন জুয়া, গরুর ব্যবসা এবং অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা হতো। চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় ছিল।
পুলিশের তথ্যমতে, চক্রটির মূলহোতা ইকবালের বিরুদ্ধে ফেনী ও নোয়াখালী জেলায় একই ধরনের সাইবার প্রতারণার একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আরেক সদস্য রুবেলের বিরুদ্ধেও প্রতারণা সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব ও সিম সংগ্রহ করতেন। পরে এসব হিসাব অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বিভিন্ন স্থান থেকে অর্থ উত্তোলনের পর তা বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হতো।
সাইবার নিরাপত্তায় পুলিশের পরামর্শ
এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ নাগরিকদের বেশ কিছু সতর্কতামূলক পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
জিমেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ব্যাংকিং ও এমএফএস অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা।
ই-মেইলে মেইল ফরওয়ার্ডিং চালু আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (২এফএ) সক্রিয় রাখা।
ওটিপি, পিন, সিভিভি, পাসওয়ার্ড বা ভেরিফিকেশন কোড কাউকে না জানানো।
অপরিচিত লিংক, ই-মেইল, এসএমএস এবং রিমোট অ্যাকসেস অ্যাপ ব্যবহারে সতর্ক থাকা।
মোবাইল ফোনে ব্যাংকিং তথ্য বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করা।
অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে নিজের নামে সিম, বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক হিসাব খুলে না দেওয়া।
মোবাইল হারিয়ে গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও এমএফএস কর্তৃপক্ষকে জানানো।
সন্দেহজনক লগইন বা লেনদেন দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
নিয়মিত ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব পর্যবেক্ষণ করা।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গ্রাহক নিরাপত্তা জোরদারে ফেস ভেরিফিকেশন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট অথেনটিকেশন, ডিভাইস ভেরিফিকেশনসহ বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে।
পুলিশ বলছে, ডিজিটাল প্রতারণা প্রতিরোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। কোনো ব্যক্তি সাইবার অপরাধ বা অনলাইন প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করে আইনগত সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
/এনইউআ