বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আকাশভিত্তিক হুমকি মোকাবিলায় কাঁধে বহনযোগ্য বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা (MANPADS) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ধরনের অস্ত্রের মধ্যে ইরানের তৈরি ‘মিসাক’ ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার দেশটির স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
মিসাক-১: প্রথম প্রজন্মের ম্যানপ্যাড
২০০০-এর দশকের শুরুতে ইরান ‘মিসাক-১’ ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করে। এটি একটি ইনফ্রারেড-নির্দেশিত বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, যা কাঁধ থেকে নিক্ষেপ করা যায়। বিভিন্ন সূত্রের মতে, এটি চীনের QW-1 Vanguard ক্ষেপণাস্ত্রের ভিত্তিতে উন্নয়ন করা হয়েছে।
মিসাক-১-এর সর্বোচ্চ পাল্লা ৫ কিলোমিটার এবং এটি ৩০ মিটার থেকে ৪ হাজার মিটার উচ্চতায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো “ফায়ার অ্যান্ড ফরগেট” প্রযুক্তি, যার ফলে নিক্ষেপের পর অপারেটরকে আর ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না।
মিসাক-২: অধিক গতি ও উন্নত লক্ষ্য শনাক্তকরণ
২০০৬ সালে মিসাক-২-এর গণউৎপাদন শুরু হয়। এটি আগের সংস্করণের তুলনায় উন্নত ইনফ্রারেড অনুসন্ধান ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি, যা কম তাপ বিকিরণকারী লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।
মিসাক-২-এর সর্বোচ্চ গতি ২.৭ মাখেরও বেশি এবং এটি ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। উচ্চ গতির কারণে ৫ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে এটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পৌঁছাতে পারে।
মিসাক-৩: উন্নত ফিউজ প্রযুক্তির সংযোজন
২০১৭ সালে ইরান মিসাক-৩ উন্মোচন করে। বাহ্যিকভাবে এটি আগের সংস্করণগুলোর মতো হলেও এতে নতুন ধরনের লেজার প্রক্সিমিটি ফিউজ যুক্ত করা হয়েছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছাকাছি পৌঁছালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে। ফলে সরাসরি আঘাত না লাগলেও বিস্ফোরণের অভিঘাতে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে হেলিকপ্টার, ড্রোন, যুদ্ধবিমান এবং নিম্ন-উচ্চতায় উড়ন্ত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে এটি কার্যকারিতা বাড়ায়।
মোবাইল প্ল্যাটফর্মে নতুন সক্ষমতা
২০২১ সালে ইরান একটি নতুন মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র প্ল্যাটফর্ম প্রদর্শন করে, যেখানে একাধিক মিসাক ক্ষেপণাস্ত্র একটি যানবাহনে স্থাপন করা হয়। এতে উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ ব্যবস্থা যুক্ত থাকায় দ্রুত মোতায়েন ও একাধিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
এই ধরনের মোবাইল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে জনবলের প্রয়োজন কমে, পরিচালনা সহজ হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেওয়া যায়।
মিসাক-১, মিসাক-২ এবং মিসাক-৩—এই তিন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইরান তার স্বল্প-পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধাপে ধাপে উন্নত করেছে। লক্ষ্য শনাক্তকরণ, গতি, নির্ভুলতা এবং প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে ড্রোন, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো নিম্ন-উচ্চতার আকাশীয় হুমকি মোকাবিলায় মিসাক ক্ষেপণাস্ত্র পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা।