লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম সীমান্তের ঐতিহাসিক সিন্দুরমতি দিঘির পাড় জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। চৈত্র মাসের রাম নবমী তিথি উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই সিন্দুরমতি তীর্থধামে পুণ্যস্নানের জন্য লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। উত্তর জনপদের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্তরা দিঘির পবিত্র জলে স্নান করে জগতের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। ধর্মীয় আচারের বাইরেও সিন্দুরমতি মেলায় সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এটি এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
ভোর থেকেই ভক্তরা দিঘির শীতল জলে অবগাহন করে অন্তরের কলুষতা মুক্তির প্রার্থনা জানান। স্নান শেষে তারা দিঘির পাড়ে অবস্থিত রাম মন্দির, রাধাগোবিন্দ, দুর্গা ও শিব মন্দিরসহ প্রাচীন মন্দিরগুলোতে পূজা-অর্পণ করেন।
মেলার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো একে অপরের মাঝে সিঁদুর বিতরণ এবং ‘সখা-সখি’ পাতিয়ে আজীবনের বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী এই বন্ধুত্বের বন্ধন সামাজিকভাবে আপনজন হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা আজও এই জনপদের মানুষের মাঝে এক নিবিড় সামাজিক ঐক্য ধরে রেখেছে।
লোককথা অনুযায়ী, নিঃসন্তান জমিদার রাজ নারায়ণ চক্রবর্তী দিঘিটি খনন করেছিলেন। পরবর্তীতে তার দুই কন্যা সিন্দুর ও মতি অলৌকিকভাবে দিঘির মাঝখানে দেবত্বপ্রাপ্ত হন বলে বিশ্বাস করা হয়। ১৯৭৫ সালে সরকারি উদ্যোগে দিঘিটি সংস্কারের সময় এখান থেকে উদ্ধার হয় প্রাচীন যুগের বহু মুদ্রা ও মূল্যবান প্রত্নবস্তু, যা বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। সংস্কারের স্মৃতিবাহী এই দিঘিটি এখন উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন ও তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
পুরোহিত শঙ্কর চন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, শত শত বছর ধরে ভক্তরা এখানে এসে ভগবানের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এবার ভক্তদের ভক্তি আর শৃঙ্খলায় সিন্দুরমতি তার প্রকৃত আধ্যাত্মিক প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বগুড়া থেকে সপরিবারে আসা দর্শনার্থী শুনীল কুমার সরকার বলেন, বহু বছর ধরে আসার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু নিরাপত্তা আর যাতায়াত নিয়ে এক ধরণের সংশয় কাজ করত। এবার বগুড়া থেকে এসে যে পরিবেশ দেখলাম, তাতে আমি মুগ্ধ। দিঘির জলে স্নান করে আত্মিক এক প্রশান্তি পেলাম। পার্শ্ববর্তী জেলা কুড়িগ্রাম থেকে প্রতিবছর এ মেলায় আসা দর্শনার্থী রিতু রানী বলেন, এর পূর্বে বাবা ও মায়ের সাথে সিন্দুরমতিতে আসতাম। এবারে আমার কন্যা ও স্বামীকে নিয়ে এসেছি।
মেলার দর্শনার্থী লালমনিরহাটের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাপলা বেগম বলেন, বর্তমান সরকার ও প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিয়েছে মেলার দর্শনার্থীদের জন্য। একজন নারী হিসেবে মেলা প্রাঙ্গণে ঘুরে আমার মনে হয়েছে এবার পরিবেশ অনেক বেশি নিরাপদ। এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ বিশেষ করে মহিলারা নির্ভয়ে কেনাকাটা ও আচারে অংশ নিচ্ছেন। পরিবেশ বেশ স্বস্তিদায়ক।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তীর্থযাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে সব আচার সম্পন্ন করতে পারেন, সেজন্য আমরা কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। এছাড়া গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই মেলার পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তিনি বলেন, পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে এই সিন্দুরমতি মেলার পবিত্রতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। মেলাকে ঘিরে ছিল চাঁদাবাজি আর হয়রানির রাজত্ব। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে ফলে সিন্দুরমতি তার হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে। এখানে কোনো সাম্প্রদায়িক বিভেদ নেই।
সালাউদ্দিন/সাএ
