গণবিজ্ঞপ্তি জারি: মধ্যনগরে বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা
এম এ মান্নান, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)

X
ছবি : প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশের পর্যটন এলাকা টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকরা কেনাকাটার জন্য মধ্যনগর বাজারকেই সুবিধাজনক স্থান হিসেবে মনে করেন। এতে মধ্যনগরে পর্যটকের আনাগোনা বাড়ছে।
এরই মধ্যে হাউসবোট পরিচালকেরা পরিবেশবিষয়ক নিয়মনীতি না মানায় জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে বৃহত্তর টাঙ্গুয়ার হাওর ও পর্যটন এলাকা জুড়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে হাউসবোটের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পরিবেশ দূষণের মাত্রা। এ কারণে প্রশাসন ১১ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটন এলাকার পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে হাউসবোট নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন দাখিল করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে ব্যর্থ হলে হাউসবোট ট্যুর পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হবে না।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জারি করা ১১ দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইসিএ (Ecologically Critical Area) এলাকায় ইঞ্জিনচালিত হাউসবোট ও নৌযানের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাওরে প্রবেশকালে উচ্চস্বরে গান, মিউজিক বা মাইক বাজানো যাবে না। প্লাস্টিকজাত সামগ্রী বহন করা যাবে না। নিরাপদ বিশুদ্ধ পানির জন্য ওয়াটার ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে। মানববর্জ্য হাওরে ফেলা যাবে না। নৌযানে পর্যাপ্তসংখ্যক লাইফ জ্যাকেট ও লাইফবয় রিং রাখতে হবে। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সংরক্ষণ এবং গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ ও মন জুড়িয়ে দেয়। জানা যায়, ২০০০ সালের ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক জলাভূমি হিসেবে টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার সাইটের স্বীকৃতি লাভ করে। এটি মিঠাপানির মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং দেশি-বিদেশি অতিথি পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। তবে বর্তমানে নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন ও হাউসবোটের দৌরাত্ম্যে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
হাওরের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এক পাশে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, অন্য পাশে হাওরের বুকে সারি সারি হিজল-করচ গাছ—যা চোখে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব সমন্বয় প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটককে টাঙ্গুয়ার হাওরে টেনে আনে। দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র টেকেরঘাট, শিমুল বাগান, বারেকের টিলা, যাদুকাটা নদী ও নীলাদ্রি লেক। এ ছাড়া মধ্যনগরের নান্দনিক ভাইরাল ব্রিজ দেখতে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসেন।
তবে মধ্যনগরে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় পাবলিক টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, বিশ্রামাগার ও পার্কিং সুবিধার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনাও নেই। অন্যদিকে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে হাউসবোটের সংখ্যাও। এর ফলে শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও মানববর্জ্যের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ-ছয় বছর আগেও টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোটের সংখ্যা ছিল শতাধিক। বর্তমানে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এ সংখ্যা বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০-তে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।