শিল্পনগরী খুলনায় প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো।
শয্যা সংকটের কারণে নির্ধারিত ওয়ার্ডের পাশাপাশি বারান্দা, মেঝে ও করিডোরেও বেড পেতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) পক্ষ থেকে মশক নিধন ওষুধ ছিটানো, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও এডিস মশার উপদ্রব কমছে না। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি নগরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে কেসিসি ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
৫০০ শয্যার খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চারগুণের বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় ওয়ার্ড, করিডোর, মেঝে থেকে হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন স্থানেও ঠাঁই হয়েছে রোগীদের। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) থেকে হাসপাতালের পুরোনো জরুরি বিভাগে ৩০ শয্যার নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, খুলনা জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি হাসপাতালে ৬৬ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৭ জনসহ মোট ৯৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে ৮০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন একজন। খুলনায় মোট রোগীর সংখ্যা ১৭৩ জন। চিকিৎসাধীন আছেন ৬৬৭ জন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩০ জন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫০০ শয্যার খুমেক হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার রোগী ভর্তি রয়েছেন। ধারণক্ষমতার চারগুণের বেশি রোগী হওয়ায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে জায়গা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ওয়ার্ডের পাশাপাশি করিডোর, মেঝে এমনকি হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন স্থানেও বসে কিংবা শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে রোগীদের। একটি বেড খালি হওয়ার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন রোগী ও স্বজনরা।
চিকিৎসকরা জানান, শুধু খুলনা নগরীর রোগী নয়, আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও জটিল অবস্থায় থাকা রোগীদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। এতে হাসপাতালটির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরীর অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও রোগীর চাপ বেড়েছে।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে দেখা দিয়েছে রক্তের তীব্র সংকট। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে দিন-রাত এক করছেন স্বজনরা। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সাধ্যমতো রক্ত সংগ্রহের চেষ্টা চালালেও স্থানীয় ব্লাড ব্যাংকগুলোতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, শুধু হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। মাঠ পর্যায়ে মশক নিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কার্যকর ও সমন্বিতভাবে জোরদার করতে হবে। তা না হলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় রোগীর উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এবং ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে খুমেক হাসপাতালের পুরোনো জরুরি বিভাগে নতুন ৫০ শয্যার ডেঙ্গু ইউনিট প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। ওই অর্থে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের জন্য ৩০টি আধুনিক বেড কেনা হয়েছে।
সব প্রস্তুতি শেষে শনিবার থেকে ৩০ শয্যার নতুন ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন ডেঙ্গু ইউনিট চালু হওয়ায় সাধারণ রোগীদের ওপর কিছুটা হলেও চাপ কমবে। তবে শুধু বেড স্থাপন করলেই হবে না; অক্সিজেন ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স এবং ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।