১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণের কথা সামনে রেখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি দিন প্রবীণদের নিয়ে আলোচনা করলেই কি তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
প্রবীণরা কোনো পরিবারের বোঝা নন, সমাজেরও বোঝা নন। তাঁরা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্মাণযাত্রার জীবন্ত সাক্ষী। আজকের প্রজন্ম যে শিক্ষা, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে, তার পেছনে রয়েছে প্রবীণদের শ্রম, ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও অবদান। তাই বার্ধক্যকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা নয়; বরং এটিকে জীবনের একটি স্বাভাবিক পর্যায় হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
আইনে প্রবীণের অধিকার ও সন্তানের দায়িত্ব: বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদের (ঘ) উপধারায় বার্ধক্যজনিত কারণে অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য সরকারি সাহায্যসহ সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের জন্য সমতার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা শুধু মানবিক বিষয় নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্বের সঙ্গেও তা সম্পর্কিত।
প্রবীণ বাবা-মায়ের অধিকার সুরক্ষায় বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩। এই আইনের ২ ধারায় ‘ভরণ-পোষণ’-এর মধ্যে খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, বসবাসের সুবিধার পাশাপাশি সঙ্গ প্রদানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বাবা-মায়ের দায়িত্ব শুধু মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে শেষ করার বিষয় নয়; তাঁদের সঙ্গে থাকা, খোঁজ নেওয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকাও আইনের ধারণার অংশ।
আইনের ৩(১) ধারায় প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। একাধিক সন্তান থাকলে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দায়িত্ব পালন করবে—এ কথাও ৩(২) ধারায় বলা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে—সন্তান তার পিতা বা মাতাকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধ নিবাস বা অন্য কোথাও বসবাস করতে বাধ্য করতে পারবে না। ৩(৫) ধারায় বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজখবর, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার কথা বলা হয়েছে। তাঁরা আলাদা থাকলে নিয়মিত সাক্ষাতের দায়িত্বও রয়েছে ৩(৬) ধারায়। এমনকি ৩(৭) ধারায় পৃথকভাবে বসবাসকারী বাবা-মাকে সন্তানের আয় থেকে যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ নিয়মিত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এই আইন মূলত পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার আইন। প্রত্যেক প্রবীণ নাগরিকের সব ধরনের অধিকারকে একটি মাত্র আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা ঠিক হবে না।
জাতীয় নীতিতেও প্রবীণদের মর্যাদা: বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা গ্রহণ করেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি তালিকাতেও জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবীণ নীতিতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তাঁদের মর্যাদা, স্বাস্থ্য, আয়-নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নীতির জায়গা থেকেও বার্তাটি স্পষ্ট—প্রবীণদের অবহেলা করার সুযোগ নেই। বাস্তবতা কি আইনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে? এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শহুরে জীবনে যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার বাড়ছে। সন্তানদের কর্মব্যস্ততা, বিদেশে বা দূরের শহরে বসবাস, আর্থিক চাপ এবং পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্বে ভুগছেন। কারও সন্তান নিয়মিত টাকা পাঠালেও সময় দেন না; কেউ একই বাড়িতে থেকেও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন।
অথচ একজন প্রবীণের প্রয়োজন শুধু খাবার ও ওষুধ নয়। প্রয়োজন সম্মান, নিরাপত্তা, কথা বলার মানুষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি।
আইনে ‘সঙ্গ প্রদান’-কে ভরণ-পোষণের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্যেই বিষয়টির গভীরতা রয়েছে। কারণ একাকিত্বও প্রবীণ জীবনের বড় সংকট।
প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে:, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়স কাঠামোও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮.৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠী এখন আর ছোট কোনো অংশ নয়; ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে।
প্রবীণ ভাতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়: বাংলাদেশে বয়স্ক ভাতা ও বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশও উল্লেখ করেছে যে দেশে প্রবীণদের সুরক্ষায় বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে, কিন্তু বিপুলসংখ্যক প্রবীণ এখনো এসব কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন।
তাই শুধু ভাতার পরিমাণ নিয়ে আলোচনা না করে প্রশ্ন হওয়া উচিত—যে প্রবীণ মানুষটি ভাতা পাচ্ছেন, তিনি কি চিকিৎসা পাচ্ছেন? নিরাপদ বাসস্থান পাচ্ছেন? তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলছে? তিনি কি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারছেন? তাঁর সিদ্ধান্তকে কি পরিবার গুরুত্ব দিচ্ছে?
প্রবীণবান্ধব সমাজ মানে শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা।
প্রবীণরা বোঝা নন, তাঁরা আমাদের সম্পদ: আমরা প্রায়ই কর্মক্ষমতা দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করি। যে ব্যক্তি আগের মতো কাজ করতে পারেন না, তাঁকে ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে শুরু করি। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বদলাতে হবে। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হয়তো আর শ্রেণিকক্ষে পড়ান না, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাতে পারে।
তাঁদের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে প্রবীণদের নিয়ে পরামর্শ পরিষদ, সামাজিক কর্মকাণ্ড, তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়, দক্ষতা ও স্মৃতির সংরক্ষণ—এসব উদ্যোগ সমাজকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার সামাজিক আন্দোলন: পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ থাকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাবা-মাকে ভালোবাসার জন্য মামলা করার প্রয়োজন হবে—এমন সমাজ আমরা চাই না। আইন অপরাধের প্রতিকার দিতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধ আইন দিয়ে তৈরি করা যায় না। তাই পরিবার থেকেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে। সন্তানকে শেখাতে হবে—বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া কোনো দয়া নয়, এটি দায়িত্ব। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, প্রবীণ নাগরিক যেন চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।
মানসিক পরিবর্তন প্রবীণদের নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। বয়স বাড়লেই একজন মানুষ অপ্রয়োজনীয় বা পরিবারের বোঝা হয়ে যান—এই ধারণা বদলাতে হবে। প্রবীণদের প্রয়োজন শুধু অর্থ বা চিকিৎসা নয়; প্রয়োজন ভালোবাসা, সম্মান, সময় ও পারিবারিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
আমাদের সমাজের প্রথা অনুযায়ী ছেলের সংসারেই বৃদ্ধ হলে বাবা- মা থাকনে। কিন্তু অধিকাংশ পরিবারে দেখা যায় একমাস এক ছেলের কাছে আরেকমাস অন্য ছেলের কাছে। আবার দেখা যায় বাবা এক ছেলের কাছে আর মা আরেক ছেলের কাছে থাকতে হয়। অথচ এই বাবা মা ই বড় করেছে তারা তো ছোটবেলা ভাগ করে লালন পালন করেনি সন্তানদের; তাহলে বৃদ্ধ বয়সে এসে কেন এমন! মনে রাখতে হবে, আজ যাঁরা প্রবীণ, একদিন আমরাও সেই বয়সে পৌঁছাব। তাই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়তে প্রথম পরিবর্তনটি আসতে হবে আমাদের মানসিকতায়।
প্রবীণ দিবসে আমরা যদি শুধু ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাই, সভা করি আর ব্যানার টাঙাই, তাহলে দিবসটির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
আজকের তরুণই আগামী দিনের প্রবীণ। আমরা আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে যেমন আচরণ করছি, একদিন আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও আমাদের সঙ্গে তেমন আচরণ করতে পারে। তাই প্রবীণদের দিকে করুণার চোখে নয়, অধিকার ও মর্যাদার চোখে তাকাতে হবে। প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন। তাঁরা আমাদের অতীতের নির্মাতা, বর্তমানের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়—তার সবচেয়ে বয়স্ক, সবচেয়ে অসহায় এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ নাগরিকদের সে কতটা সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে পারে, তার মধ্যেও। প্রবীণদের সম্মান করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।
লেখক: শফিকুল ইসলাম খোকন, সাংবাদিক, কলামলেখক ও গবেষক