সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে যমুনা নদীর বুকে একের পর এক চর জেগে ওঠায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে দুর্গম চরাঞ্চলের প্রায় দেড় লাখ মানুষের যাতায়াতে বাড়ছে দুর্ভোগ। বর্ষা মৌসুমে নৌকাই তাদের প্রধান ভরসা। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে দীর্ঘ পথ হেঁটে নদীর পাড়ে এসে নৌকায় উঠতে হয়। উপজেলা ও জেলা শহরে যাতায়াত থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, সব ক্ষেত্রেই নৌকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের।
কাজীপুর উপজেলার মেঘাই, নাটুয়ারপাড়া, খুদবান্ধি, ঢেকুরিয়া, তেকানী, খাসরাজবাড়ী, মাজনাবাড়ী, সানবান্ধা ও চরগিরিশ ঘাট ঘুরে দেখা যায়, নদীর পাড়ে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের নৌকা। এসব নৌকা দিয়ে কাজীপুরের চরাঞ্চলের পাশাপাশি বগুড়ার ধুনট ও সারিয়াকান্দি, জামালপুরের সরিষাবাড়ী এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াত করেন মানুষ। কিছু নৌকা আবার শুধু নদী পারাপারের কাজে ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যমুনা সেতু নির্মাণের আগে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল কাজীপুরের এসব নৌঘাট। তখন ঘাটগুলোতে বড় বড় জাহাজ, স্টিমার ও লঞ্চ ভিড়ত। দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা এসব ঘাট দিয়ে নদী পার হতেন। ঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। যাত্রীদের রাতযাপনের জন্য মেঘাই ও নাটুয়ারপাড়া ঘাট এলাকায় ছিল ভাসমান হোটেলও।
নদী পার হওয়ার জন্য এসে লঞ্চ না পেলে অনেক যাত্রী এসব ভাসমান হোটেলে রাত কাটাতেন। পরদিন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতেন। সে সময় যমুনায় পানির গভীরতা ও স্রোত বেশি থাকায় নৌযান চলাচলও ছিল তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর চিত্র বদলে গেছে। যমুনা সেতু চালুর পর এসব ঘাট থেকে লঞ্চ ও স্টিমারের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কমতে থাকে যাত্রীদের আনাগোনা। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে। জীবিকা হারিয়ে অনেক মানুষ বেকার হয়ে পড়েন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদী সংরক্ষণ ও নিয়মিত খননের উদ্যোগ না থাকায় যমুনার নাব্যতা সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে নদীর বিস্তীর্ণ অংশ বালুচরে পরিণত হয়। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি জেগে ওঠে, অন্যদিকে নৌপথ সংকুচিত হয়ে চরবাসীর যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন মাইজবাড়ী চরের বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, “চরের মানুষের জন্য শুষ্ক কিংবা বর্ষা, কোনো মৌসুমেই নৌকার প্রয়োজন ফুরায় না। সব সময়ই যমুনা পার হতে নৌকা লাগে। বর্ষায় এর প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কম থাকায় দুর্ভোগ বেশি হয়। পানি থাকলে নৌকা নিয়ে অনেকেই বাড়ির কাছাকাছি নামতে পারেন। কিন্তু পানি কমে গেলে তা সম্ভব হয় না।”
তেকানী চরের সাবেক ইউপি সদস্য শাহজাহান আলী বলেন, উপজেলা ও জেলা শহরে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নৌকার বিকল্প নেই। শুষ্ক মৌসুমে অনেক মানুষকে হেঁটে নদীর পাড়ে আসতে হয়। এরপর নৌকায় উঠে ঘাটে পৌঁছাতে হয়। চরের মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। আগের মতো ঘাটে নৌকাও পাওয়া যায় না। নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় অনেক সময় নৌকা আটকে যায়।
নাটুয়ারপাড়া নৌঘাটের চেইন মাস্টার রফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা নদীর আগের সেই রূপ আর নেই। নদী অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। নৌযান চলাচলও কমে এসেছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী নৌকার সংখ্যা দিন দিন কমছে।
নৌকার মাঝি শফিকুল ইসলাম বলেন, নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু যাত্রী কমে যাওয়ায় সেই খরচ তুলে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে নৌকা চালিয়ে আগের মতো আয় করা যায় না। বর্তমানে অনেক নৌকা যাত্রী পরিবহনের বদলে বালু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কাজীপুর উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রাশিদুল হাসান জানান, উপজেলার চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় দেড় লাখ মানুষ বসবাস করেন। এসব মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা।
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.
Scale Your Newsportal
Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.