
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি করে ডেনিস উন্দাভ-ইন্টারনেট
জার্মানির জার্সিতে যিনি এখন বিশ্বকাপ মাতাচ্ছেন, সেই ডেনিস উন্দাভের ফুটবলার হওয়ায়ই একসময় ছিল অনেক দূরের পথ। তবে দমে যাননি তিনি। জীবনের সব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে গেছেন স্বপ্নের পানে। আর এখন বিশ্ব মঞ্চে শুধু দেশের প্রতিনিধিত্বই করছেন না তিনি, সবুজ গালিচায় বল পায়ে ছড়িয়ে যাচ্ছেন দ্যুতিও।
আইভরি কোস্টের বিপক্ষে যখন জার্মানিকে চোখ রাঙাচ্ছিল পরাজয়, চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য ত্রাতা হয়ে আসেন ২৯ বছর বয়সী উন্দাভ। বদলি নেমে দুটি গোল করে দলকে এনে দেন দারুণ এক জয়। ২-১ ব্যবধানের স্বস্তির জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জার্মানরা। সঙ্গে ২০১৪ বিশ্বকাপের পর প্রথমবার নক আউট পর্বে জায়গা করে নেয় জার্মানি।
শুধু এই ম্যাচেই নয়, বিশ্বকাপে নিজের অভিষেক ম্যাচে কুরাসাওয়ের বিপক্ষেও জালের দেখা পান উন্দাভ। সেদিন একটি গোল করেন তিনি, সঙ্গে অ্যাসিস্ট করেন দুটি। ম্যাচটি ৭-১ ব্যবধানে জেতে জার্মানি। গত ২৪ বছর বিশ্বকাপে নিজের প্রথম দুই ম্যাচে গোলের দেখা পাননি জার্মানির কেউ। উন্দাভের সৌজন্যে সেই অপেক্ষার অবসান হলো এবার। তার আগে এই কীর্তি গড়েছিলেন মিরোস্লাভ ক্লোসা, ২০০২ সালে।
বিশ্বকাপে খেলা তো দূরের কথা, উন্দাভের ফুটবলার হওয়ারই কথা ছিল না। ১৪ বছর বয়সে তাকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করে বাদ দিয়েছিল জার্মান ক্লাব ভার্ডার ব্রেমেন। তবুও স্বপ্নের পথে ছোটা বন্ধ করেননি তিনি। এরপর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান উন্দাভ ১৭ বছর বয়সে। তখন জার্মানির চতুর্থ সারির একটি ক্লাবে আধা-পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে সপ্তাহে পেতেন ১২০ পাউন্ড। এত অল্পে অর্থে কী আর জীবনযাপন করা যায়! তাই একটি কারখানায় ৮ ঘণ্টার শিফটে কাজও করতেন ওই সময়ের তরুণ উন্দাভ।
বেলজিয়ামের একটি সংবাদমাধ্যম সেভেনসারসেভেন-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জীবনের কঠিন সময়ের খানিকটা তুলে ধরেন উন্দাভ,‘ ১৪ বছর বয়সে ভার্ডার যখন আমাকে বলল যে, আমার উচ্চতা কম হওয়ায় তাদের দলে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তখন আমার হৃদয়টা ভেঙে গিয়েছিল। তবে আমি আশা হারাইনি। ১৭ বছর বয়সে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসের সঙ্গে চুক্তি করতে আমি ঘর ছাড়ি। সেখানে খেলা ও অনুশীলনের পাশাপাশি ফুল-টাইম একটি কাজও করতাম। একটি কারখানায় লেজার মেশিন অপারেটর হিসেবে দৈনিক আট ঘণ্টার কাজ ছিল আমার।”
কীভাবে দিন কাটত তার, সেটার কিছুটাও খোলাসা করেন উন্দাভ। ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে কারখানায় যেতাম, সেখান থেকে অনুশীলনে যেতাম, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ৮টা বেজে যেতৃ পরদিন আবার একই রুটিন। বেঁচে থাকার জন্য টাকার প্রয়োজন ছিল বলেই কাজটা করতে হতো। শুধু ফুটবল থেকে পাওয়া অর্থে আমার চলত না।”
২০২০ সালে বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-গিলোয় যোগ দেন উন্দাভ। পরের বছরই ক্লাবটিকে শীর্ষ স্তরে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। সেখানে সর্বোচ্চ লিগে ২৫টি গোল করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটন অ্যান্ড হোভ অ্যালবিয়নের নজরে আসেন।
তবে ব্রাইটনের অধ্যায় সুখকর হয়নি তার। ২০২২-২৩ মৌসুমে ক্লাবটির জার্সিতে ২২টি লিগ ম্যাচ খেলে মাত্র ৫ গোল করেন তিনি। পরে তাকে স্টুটগার্টে ধারে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালে জার্মান ক্লাবটি উন্দাভকে পাকাপাকিভাবে রেখে দেয়।
২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্ডেসলিগায় ১৯টি গোল করেন উন্দাভ। লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েই জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নিজের জায়গা পাকা করেন এই স্ট্রাইকার। আর এখন বিশ্ব মঞ্চে দেখিয়ে যাচ্ছেন নিজের সামর্থ্য। কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া প্রথম ম্যাচে বদলি নেমে ঝলক দেখিয়েছিলেন উন্দাভ। এবার দুই গোল করে তিনিই মূল নায়ক।
বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে উন্দাভকে বদলি হিসেবে খেলিয়েছেন জার্মানির কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান। সুযোগ যেভাবে লাগিয়েছেন এই ফুটবলার, তাতে খুশি নাগেলসমান। একুয়েডরের বিপক্ষে উন্দাভকে শুরুর একাদশে খেলানোর আভাসও দিয়ে রেখেছেন তিনি।