ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, জ্বালানির ঊর্ধ্বমুখী দাম, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে শনিবার, ১৭ অক্টোবর, দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ লিয়ঁ, রেন, মার্সেই এবং অন্যান্য বড় শহরে বিক্ষোভকারীরা রাজপথে নেমে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন। আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন, পরিবেশকর্মী, কৃষক এবং ২০১৮ সালের ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সরকারি পরিষেবার মানোন্নয়ন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাসে প্যারিসের বাইরে প্রায় দেড় লাখ এবং রাজধানীতে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা জানানো হয়েছিল। তবে এসব সংখ্যা ছিল বিক্ষোভ শুরুর আগের অনুমান, প্রকৃত অংশগ্রহণকারীর চূড়ান্ত হিসাব নয়। অন্যদিকে, রয়টার্সের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দুপুরের আগেই প্যারিসের বাইরে দেশজুড়ে ১৪০টির বেশি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ৩২ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। এটি দিনের একটি প্রাথমিক পরিসংখ্যান; পরবর্তী সময়ে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসন্তোষ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নের দাবি জানিয়েছে। ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান শ্রমিক সংগঠন কনফেডারেশন জেনেরাল দু ত্রাভাই সিজিটি দেশজুড়ে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং সরকারি পরিষেবার মানোন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এবারের বিক্ষোভের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দাবিও যুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষায় বৈষম্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ এবং পারকুরসুপ ভর্তি ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন। শিক্ষার্থীদের একাংশের দাবি, শিক্ষার সুযোগ ও মান নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের আবাসন, খাবার ও দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর চাপও আলোচনায় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন আহ্বানের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকদের একই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার উদ্যোগ দেখা গেছে। ফলে অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত দাবিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আন্দোলনের একটি যৌথ রূপ তৈরি হয়েছে।
বিক্ষোভ ঘিরে কয়েকটি শহরে উত্তেজনা ও পুলিশের অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের কয়েকটি দলকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ অভিযান চালায়। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা পর্যন্ত ৬১ জনকে আটক করার কথা জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের খবরও এসেছে। বিক্ষোভকারীরা একটি প্রাইভেট গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়।কিছু এলাকায় সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ এবং কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের কার্যক্রমে বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে।
লিয়ঁ শহরে তামাক উৎপাদন কারখানা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কাছে প্রায় ৩০০ জনের একটি জমায়েত পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে। পরে অন্য এলাকায়ও পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয় এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে, রেন শহরের একটি সড়কে জ্বলন্ত ব্যারিকেড তৈরির কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শহরটির রিং রোডের কিছু অংশেও যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে।
মার্সেই শহরে একটি অননুমোদিত জমায়েতের সময় পৌর পুলিশের একটি থানায় হামলার ঘটনা ঘটে। জানালা ভাঙচুর করা হয় এবং ভবনের ভেতরে ধোঁয়া তৈরির উপকরণ ছোড়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, আগুন লাগানোর চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে এবং এ ঘটনায় কেউ আহত হননি। শহরটির সরকারি ভবন ও কিছু দোকানে ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার পর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তবে পৃথক ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, আটক ব্যক্তির মোট সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষ।
বিক্ষোভের আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ শান্ত থাকার এবং ব্যক্তি ও সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, কর্তৃপক্ষ প্যারিসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি নেয়। সরকারের সামনে একদিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে সহিংসতা ও ভাঙচুর প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চাপও বাড়ছে।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে চলমান বিতর্কে সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত তিন হাজার শিক্ষক নিয়োগ বা বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর একাংশের মতে, শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের অবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকারের সমস্যার সমাধানে আরও পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলীয় শহর স্ট্রাসবুর্গেও শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কর্মসূচির সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তবে ১৭ অক্টোবর শহরটির বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বিশেষ করে এসপ্লানাদ ক্যাম্পাসে নির্দিষ্ট কোনো বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার, সংঘর্ষ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে শহরটির পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত দাবি করার আগে স্থানীয় প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভ ফ্রান্সে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, শিক্ষার্থীদের দাবি এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলনের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তবে এই আন্দোলন কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আগামী দিনগুলোতে নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে বড় শহরগুলোতে যান চলাচল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও জনজীবনে প্রভাব পড়তে পারে। তবে নতুন কর্মসূচি বা অবরোধের বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিই ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং শ্রমিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর কর্মসূচির ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ।