ঢাকা: মুদ্রা বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিনেই ব্যাংকিং খাত থেকে নিট ৪ হাজার ৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। তবে একই সময়ে দেখা গেছে সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। যেখানে প্রচলিত ধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত অলস অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখছে, সেখানে তারল্য সংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংকগুলো নতুন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার করছে।
রবিবার(২১ জুন)বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ১৮ জুন ওপেন মার্কেট অপারেশনের (ওএমও) আওতায় এই অর্থ শোষণ করা হয়। দিনটির লেনদেনে ব্যাংক খাতের দুই অংশের অবস্থান ছিল একেবারেই ভিন্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে অতিরিক্ত তারল্য থাকায় তারা একদিন মেয়াদি স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ব্যবস্থার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে। এ খাতে মোট জমার পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা।
এর বিপরীতে মেয়াদপূর্তির কারণে ৫ হাজার ৪২২ কোটি ১১ লাখ টাকা সমন্বয় করা হয়। ফলে দিন শেষে এসডিএফের মাধ্যমে বাজার থেকে নিট ৪ হাজার ৯০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা তুলে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
বর্তমানে এসডিএফের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে নীতি সুদ দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকারদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ব্যাংক এখন তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ জমা রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগে ধীরগতির কারণে ব্যাংকগুলোর একটি অংশের হাতে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হচ্ছে। সেই অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে প্রবাহিত না হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে শরিয়াভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর চিত্র ছিল ভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে চলা তারল্য সংকট মোকাবিলায় এসব ব্যাংক আবারও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সহায়তা তহবিলের ওপর নির্ভর করেছে।
সাত দিন মেয়াদি ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ) থেকে ইসলামী ব্যাংকগুলো নতুন করে ৭৩০ কোটি ৯৫ লাখ টাকা গ্রহণ করে। একই সময়ে আগের ৬৯৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকার দায় পরিশোধ হওয়ায় এ খাতের মাধ্যমে বাজারে নিট ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা নতুন করে প্রবেশ করে।
এই তহবিলের ক্ষেত্রে প্রফিট শেয়ারিং রেশিও (পিএসআর) ও এক্সপেক্টেড প্রফিট রেট (ইপিআর) অনুযায়ী ৪ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত কয়েক মাস ধরেই বেশ কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক নিয়মিতভাবে এই বিশেষ সুবিধার আওতায় অর্থ নিচ্ছে। এতে খাতটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩১ কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ বাজারে প্রবেশ করলেও এসডিএফের মাধ্যমে প্রচলিত ব্যাংকগুলো থেকে ৪ হাজার ৯০ কোটি টাকার বেশি অর্থ উঠে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে বাজার থেকে নিট ৪ হাজার ৫৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা শোষিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বর্তমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। বাজারে অর্থের সরবরাহ কমিয়ে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তবে তাদের মতে, একই দিনে ব্যাংক খাতের দুই বিপরীত চিত্র—একদিকে অলস অর্থের পাহাড়, অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ধারনির্ভরতা—দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও দুর্বলতার বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।