বুধবার , ২১ অক্টোবর ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলা
  5. খেলাধুলা
  6. জাতীয়
  7. তথ্য-প্রযুক্তি
  8. দেশজুড়ে
  9. প্রবাস
  10. প্রাকৃতিক দুর্যোগ
  11. বিনোদন
  12. মতামত
  13. রাজনীতি
  14. লাইফস্টাইল
  15. শিক্ষা

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী হ্রাস: কোন দিকে যাচ্ছে জাতির ভবিষ্যত


অক্টোবর ২১, ২০২৬ ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, অথচ শিক্ষার্থী কমছে- এই বৈপরীত্যের গভীরে আছে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, মান, ব্যয় ও বৈষম্যের কঠিন প্রশ্ন। চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পরিসংখ্যানকে তাই নিছক সংখ্যার ওঠানামা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন কারণ অনুসন্ধান, কার্যকর নীতি এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার বাস্তব উদ্যোগ।

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কেবল কয়টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলো কিংবা কতটি নতুন ভবন নির্মিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে কতজন শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, কতজন পড়াশোনা শেষ করছে এবং কতজন প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারছে তার ওপর।

এই সহজ সত্যটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারণে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি করেছে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান+২০২৫ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল ৯০ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখ ২৫ হাজারের বেশি।

অন্যদিকে জুনিয়র স্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৯ হাজার ১১৭ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ১৯ হাজার ২১১। অর্থাৎ বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, কিন্তু শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখের বেশি। পরিসংখ্যানের এই বৈপরীত্য আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

শিক্ষার্থী কমছে কেন? ব্যানবেইসের প্রতিবেদন নিজে এই হ্রাসের নির্দিষ্ট কারণ বিশ্লেষণ করেনি। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা করোনাকালীন শিখনঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাবকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এসব কারণের কোনটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও এলাকাভিত্তিক গবেষণা। অনুমানকে নীতির ভিত্তি করা যাবে না। আবার গবেষণার অপেক্ষায় থেকে দৃশ্যমান সংকট মোকাবিলার উদ্যোগও পিছিয়ে দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে- প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তি বাড়ানোকে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হলেও পরবর্তী পর্যায়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং শিক্ষা সম্পন্ন করা এক বিষয় নয়।

একজন শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করলেই যে সে নির্বিঘ্নে মাধ্যমিকে পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার পরও দারিদ্র্য, দুর্বল শিখনভিত্তি, পারিবারিক দায়িত্ব, অনুপস্থিতি কিংবা বিদ্যালয়ের প্রতি অনাগ্রহ তার শিক্ষাজীবনকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

ইউনিসেফের শিক্ষা-সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে মাত্র ৬৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের MICS ২০২৫ অনুযায়ী, নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের সমাপ্তির হার ৬৯.৩ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তা ৪৩.৯ শতাংশ।

এসব তথ্যের পরিধি ও হিসাবপদ্ধতি ব্যানবেইসের বার্ষিক শিক্ষার্থীসংখ্যার সঙ্গে এক নয়। তবু এগুলো শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের টিকে থাকা এবং শিক্ষা সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জ আছে, তা স্পষ্ট করে।

শিক্ষার্থী হারানোর পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দরিদ্র পরিবারের কাছে সন্তানের শিক্ষার ব্যয় শুধু বই-খাতা কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যাতায়াত, পোশাক, পরীক্ষা, অতিরিক্ত পড়াশোনা এবং বিদ্যালয়ে যাওয়ার কারণে সম্ভাব্য আয়ের যে সুযোগ হারাতে হয়, সেটাও পরিবারের হিসাবের অংশ।

খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে যখন একটি পরিবার হিমশিম খায়, তখন সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার চেয়ে তাৎক্ষণিক উপার্জনকে বেশি জরুরি মনে হতে পারে। কোনো কিশোর কাজে যোগ দিলে পরিবার হয়তো সাময়িকভাবে স্বস্তি পায়। কিন্তু তার বিনিময়ে ভবিষ্যতের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সংকুচিত হয়।

প্রাথমিক শিক্ষার পরিসংখ্যানও এই উদ্বেগকে বাড়িয়ে দেয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ঝরে পড়ার হার ২০২৩ সালের ১৩.১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.২৫ শতাংশ হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আর্থিক চাপ এবং অল্প বয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে তার প্রভাব পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিকেও পড়তে পারে। ফলে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমার সমস্যা সমাধান করতে হলে শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রিক পদক্ষেপ যথেষ্ট হবে না; প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পুরো শিক্ষাপথের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।

মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত ১ হাজার ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পারে, তাদের মধ্যে ৫৪৯ জনের বিয়ে হয়ে গেছে।

তাদের ৯৭ শতাংশই ছাত্রী। এই অনুসন্ধান সব অনুপস্থিত পরীক্ষার্থী বা সব ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তবু এটা একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে হয়েছে। বাল্যবিবাহের সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ হারানোর সম্পর্ক সুস্পষ্টভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

একজন কিশোরী বিয়ের কারণে বিদ্যালয় ছেড়ে দিলে ক্ষতিটা শুধু তার ব্যক্তিগত শিক্ষাজীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ভবিষ্যৎ আয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে। একইভাবে, অর্থনৈতিক চাপে কোনো কিশোর শ্রমে যুক্ত হলে তার দক্ষতা অর্জন ও ভালো কর্মসংস্থানে প্রবেশের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিক্ষার্থী ধরে রাখার নীতিকে সামাজিক সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং শিশুশ্রম বন্ধের উদ্যোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না।

শিক্ষার মানের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থী যদি শ্রেণি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে পরবর্তী শ্রেণির পাঠ তার কাছে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

দুর্বল ভিত্তির ওপর পরবর্তী শিক্ষা দাঁড় করাতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের শিখনঘাটতি, অনিয়মিত উপস্থিতি, পরীক্ষাভীতি এবং দুর্বল ফলাফল একসময় বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। সে কারণে শিক্ষার্থী কমার কারণ অনুসন্ধানে শুধু ভর্তি ও উপস্থিতির তথ্য নয়, শ্রেণিভিত্তিক শিখনফল, উত্তরণ, পুনরাবৃত্তি এবং শিক্ষা সমাপ্তির তথ্যও বিশ্লেষণ করতে হবে।

এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর নীতিও পর্যালোচনার দাবি রাখে। একটি এলাকায় নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই ইতিবাচক হতে পারে, যদি সেখানে শিক্ষার্থীর চাহিদা থাকে এবং মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষক, উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষাসামগ্রী ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ নেই।

আবার কোথাও শিক্ষার্থীর চাহিদা কমে গেলেও পুরোনো পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করা হলে জনসম্পদ ও অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা, বিদ্যালয়ের দূরত্ব, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শিক্ষকসংখ্যা এবং অবকাঠামোর সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বাড়ার তথ্যও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী ২০২৪ সালের ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি থেকে ২০২৫ সালে ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী ২৯ হাজার ৭৭ থেকে বেড়ে ২৯ হাজার ৬৭২ হয়েছে।

বিপরীতে স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ৬ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি থেকে কমে ৬ লাখ ৫০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব ধারার শিক্ষার্থীসংখ্যা তুলনা করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সরাসরি অন্য ধারায় শিক্ষার্থীদের স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এর জন্য শিক্ষার্থীদের ভর্তি, স্থানান্তর ও শিক্ষা সমাপ্তির ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন।

কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ক্ষেত্রে এই হ্রাস বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অথচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র উঠে এসেছে।

কর্মমুখী শিক্ষা যদি শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, প্রশিক্ষণের মান ও চাকরির সম্ভাবনা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা তৈরি না হয়, কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় উপকরণ ও দক্ষ প্রশিক্ষক না পায়, তাহলে শুধু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা যাবে না। কারিগরি শিক্ষাকে মর্যাদাপূর্ণ, মানসম্মত এবং কর্মসংস্থানমুখী করে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি নির্ভরযোগ্য শিক্ষার্থী-অনুসরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কোন বিদ্যালয় থেকে কতজন শিক্ষার্থী হারিয়ে যাচ্ছে, কোন শ্রেণিতে ঝরে পড়ার প্রবণতা বেশি, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য কতটা, কোন অঞ্চলে দারিদ্র্য বা বাল্যবিবাহের প্রভাব বেশি- এসব তথ্য একসাথে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ভর্তি থেকে শিক্ষা সমাপ্তি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর অগ্রগতি অনুসরণ করা গেলে কোথায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে জনমিতিক পরিবর্তন, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন ও তথ্যগত অসংগতির কারণে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমেছে কিনা, সেটাও যাচাই করা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত, দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা আরও কার্যকর করতে হবে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপবৃত্তি নির্ধারণ, দরিদ্র এলাকায় স্কুল ফিডিং কর্মসূচি, নিরাপদ যাতায়াত, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী পরিবেশ এবং মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করা দরকার।

সহায়তা যেন শুধু তালিকাভুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; নিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষা সমাপ্তির ক্ষেত্রেও তার প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। তবে দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত না করলে শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

তৃতীয়ত, শিক্ষকসংকট, পাঠদানের মান এবং শিখনঘাটতি মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষককে শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করার দায়িত্ব দিলে চলবে না। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে, কোথায় পিছিয়ে পড়ছে এবং কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটাও বুঝতে হবে।

পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তামূলক পাঠদান, নিয়মিত শিখনমূল্যায়ন এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পরামর্শসেবা চালু করা যেতে পারে। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।

চতুর্থত, শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন ভবন বা অবকাঠামো নির্মাণের দৃশ্যমান সাফল্যের চেয়ে শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, শিখনফল উন্নত করা এবং শিক্ষা সমাপ্তির হার বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রতিটি কর্মসূচির জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য, সময়সীমা এবং জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। কোথায় অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কারা উপকৃত হচ্ছে এবং বাস্তবে কী পরিবর্তন ঘটছে- এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জনআস্থা বাড়বে।

সবশেষে, শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা বিদ্যালয় প্রশাসনের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সুরক্ষা বিভাগ, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং শ্রম অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হলে তাকে শুধু অনুপস্থিতির খাতায় নথিভুক্ত না করে কেন সে আসছে না, তা জানার ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবারের আর্থিক সংকট, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা কিংবা বিদ্যালয়ের পরিবেশ- যে কারণই থাকুক, সমাধান হতে হবে সেই অনুযায়ী।

মাধ্যমিকে এক বছরে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার তথ্য তাই একটি সতর্কসংকেত। এই সংখ্যা কতটা ঝরে পড়া, কতটা জনমিতিক পরিবর্তন এবং কতটা শিক্ষার বিভিন্ন ধারায় স্থানান্তরের ফল- তা গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এখনই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে সংকুচিত হয় তার নিজের ভবিষ্যৎ, পরিবারের সম্ভাবনা এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের সুযোগ।

বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানো উন্নয়নের একটি উপাদান। কিন্তু শিক্ষার্থী হারাতে থাকলে সেই উন্নয়নের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আরও বেশি শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করা নয়, বরং তাদের মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেওয়া। শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি তার ভবন বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় নয়- কতজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষিত, দক্ষ ও আত্মনির্ভর মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে, তার মধ্যেই নিহিত।

Scale Your Newsportal

Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.

Scale Your Newsportal

Blazing-fast frontend, robust backend & ad monetization ready.

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।

📰 ঢাকা ইনফো২৪

দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর, প্রবাসীদের তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট

আরও পড়ুন
`);w.document.close();setTimeout(function () { w.focus(); w.print(); }, 500);});});