রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগকে সবসময় জনগণের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যখন প্রশাসন ব্যর্থ হয়, রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ে কিংবা নাগরিক অধিকার হুমকির মুখে পড়ে, তখন মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হয়। সেই কারণেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে; বাংলাদেশে বিচার বিভাগ কি আবারও নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাচ্ছে?
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি ও সাংবিধানিক আন্দোলনের পর বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ছিল সেই অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দপ্তর ছিল না; বরং বিচার বিভাগের নিজস্ব প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতার প্রতীক ছিল।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার ফলে আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বিচার বিভাগের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। বিচারকদের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবস্থাপনা, আদালতের বাজেট এবং বিচারিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ ধীরে ধীরে নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়।
কিন্তু এই সচিবালয় বিলুপ্ত হলে সেই স্বাধীনতা আবার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ক্ষমতা যদি আবার সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে আদালতের স্বাধীন অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে বিচারকরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে পারেন, যা নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সমন্বয় বৃদ্ধির জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে; দক্ষতার নামে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কমিয়ে আনা কতটা যৌক্তিক? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সুবিধার চেয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আদালতের ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিক মামলায় পক্ষপাতিত্ব বাড়ে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিরোধী মত দমনের পথ সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশেও অতীতে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রশ্নে বহু বিতর্ক হয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের বিলুপ্তিকে অনেকেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দুর্বল হলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। আদালত যদি প্রশাসনিকভাবে সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এতে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
গণতন্ত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহ নয়; এটি জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি বিচার বিভাগের কাঠামোও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বদলে যায়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। তাই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা, আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সাংবিধানিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
রাষ্ট্রের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং জনগণের ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা অপরিহার্য। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জাতি।
লেখক: মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com