
বিজেপির পছন্দের তালিকায় কে?
বিজেপি ২০৭টি আসনে জিতে পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখল করেছে। এরপর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে কে হচ্ছেন বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী? মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাচ্ছেন কারা? বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় দলের দলনেতা বাছাই প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষক করা হয়েছে অমিত শাহকে। সহকারী পর্যবেক্ষক করা হয়েছে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝিকে। তবে কবে তারা কলকাতায় আসবেন সেই বিষয়ে রাজ্য বিজেপির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে কিছু জানানো হয়নি।
বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, আজ বুধবার অথবা আগামীকাল বৃহস্পতিবার কলকাতার কোনো হোটেলে এই বৈঠকটি হতে পারে। যে কোনো রাজ্যেই বিধানসভা ভোটের পরে পরিষদীয় দলনেতা বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট রাজ্যে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের পাঠান বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা দলের জয়ী প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে আলোচনা করেই অমিত শাহ মাঝি ঠিক করবেন, কাকে বসানো হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে শেষ পর্যন্ত অমিত শাহরা কাকে বসাবেন সবার নজর আপাতত সে দিকেই।
পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে একাধিক নাম চর্চায় থাকলেও পাল্লা কার ভারী, তা নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছেন না বিজেপির কোনো শীর্ষ নেতা। তবে মুখ্যমন্ত্রীর হওয়ার দৌড়ে সবার থেকে এগিয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী।
এছাড়াও বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, সাবেক রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত এবং আরেক সাবেক রাজ্য সভাপতি ও বিধায়ক দিলীপ ঘোষ, বিধায়ক সৌরভ শিকদারও।
শুভেন্দু অধিকারী কে মুখ্যমন্ত্রী পদে এগিয়ে রাখার বিষয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে রাজ্য বিজেপির কাছে।
প্রথমত- পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অন্দরে বিজেপির ভূমিকা বদলাতে চলেছে। বিধানসভায় বিজেপি বিধায়করা এ বার বিরোধী বেঞ্চের বদলে ট্রেজ়ারি বেঞ্চে বসবেন। নতুন মুখ্যমন্ত্রীই হবেন বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা। সেই হিসেবে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা থাকা শুভেন্দু অধিকারী পরিষদীয় দলনেতার দায়িত্ব নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকবে।
দ্বিতীয়ত- ২০২১ সালে নন্দীগ্রামের পর ২০২৬ সালে ভবানীপুরে। মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। পরপর দুটি বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীকে হারানোর নজির বঙ্গ–রাজনীতির ইতিহাসে এই প্রথম। একই সঙ্গে সঙ্গে ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে প্রবল জনসমর্থন নিয়ে জিতেছেন শুভেন্দু। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু।
অন্যদিকে শমীক পার্টির রাজ্য সভাপতি। ফলে খাতা-কলমে তার নেতৃত্বেই বাংলার মসনদ দখল করেছে বিজেপি। তাছাড়া, পার্টির সর্বস্তরের নেতা–কর্মী এবং সাংস্কৃতিক মহলেও শমীকের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত। তবে শমীক ২৬ এর ভোটের লড়েননি। সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর কুর্শি শমিকের হাতে তুলে দিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচনে জয় লাভ করে মুখ্যমন্ত্রীত্ব রক্ষা করতে হবে তাকে। সে ক্ষেত্রে শমিকের হাতে থাকবে শুভেন্দুর ছেড়ে দেয়া নন্দীগ্রাম অথবা ভবানীপুর, যে কোনো একটি আসন।
দলের উত্তরবঙ্গের নেতৃত্ব শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসাবে মনে করলেও, উত্তরবঙ্গ মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি রয়েছে তাদের। তৃণমূল এ বার উত্তরবঙ্গ থেকে কার্যত ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। উত্তরের ৫৪টি আসনের মধ্যে ৪০টিই বিজেপির দখলে এসেছে। সে ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গে বিজেপির জয়ের কান্ডারী সাবেক বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের নাম উঠে আসছে।
এছাড়াও বিজেপির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে স্বপন দাশগুপ্ত মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌড়ে রয়েছেন। আরএসএস-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা এবং তার অগাধ পাণ্ডিত্যই তাকে মুখ্যমন্ত্রীত্বের দৌড়ে এগিয়ে রেখেছে।
এছাড়াও মুখ্যমন্ত্রীত্বের রেসে রয়েছেন প্রয়াত সাবেক বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তপন শিকদারের ভাইপো সৌরভ শিকদার। উত্তর দমদম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তার খুব বড়সড় ছাপ না থাকলেও দিল্লির জাতীয় রাজনীতিতে বেশ কম বয়স থেকেই তার আনাগোনা। আরএসএসের সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা। বিজেপির বর্তমান জাতীয় সভাপতি নীতিন নবিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভাষন হিসেবেও পরিচিত সৌরভ। অনেকেই মনে করছেন জাতীয় রাজনীতিতে ও শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে প্রভাব থাকায় সৌরভ শিকদারের কপালে শিকে ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে।
যদিও যাবতীয় হিসেবের বাইরে থাকা কাউকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়ে দেয়ার প্রবণতা বিজেপিতে নতুন কিছু নয়। অতীতে মধ্যপ্রদেশে এবং দিল্লিতে অপরিচিত মুখকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসিয়েছেন অমিত শাহরা। বাংলাতেও যে তার পুনরাবৃত্তি হবে না, তা হলফ করে বলতে পারছেন না গেরুয়া ব্রিগেডের কেউই।
তবে বিজেপির মন্ত্রিসভায় মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও থাকবেন একাধিক উপমুখ্যমন্ত্রী এমন ইঙ্গিত মিলেছে। তৃণমূল জমানায় গত ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় কোনো উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ ছিল না। এমন কি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও নিজের হাতে রেখেছিলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা। নতুন মন্ত্রিসভায় সেই প্রথা বন্ধ করা হবে। এক বা একাধিক বিধায়ককে উপমুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসানো হতে পারে বলেও গেরুয়া শিবিরের।