ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৯টা। ইমামের কণ্ঠে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুসল্লিরা নিয়ত বাঁধলেন। কিন্তু প্রথম রাকাত শেষ করে যখন দ্বিতীয় রাকাতের প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই আকাশ থেকে মেঘ ভেঙে নামল মুষলধারে বৃষ্টি।
এই বৃষ্টিভেজা সকালেই ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত। তবে কয়েকদিন ধরে বৃষ্টির কারণে মাঠ ছিল নামাজের অনুপযুক্ত। এর মধ্যে ঈদের জামাতের দ্বিতীয় রাকাত থেকেই মুষলধারে শুরু হয় বৃষ্টি। ফলে মুসল্লিরা জুবুথুবু হয়েই নামাজ আদায় করেন।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত জামাতে ইমামতি করেন শহরের বড় বাজার জামে মসজিদের খতিব ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের প্রধান ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। বৃষ্টির মধ্যেই ঈদের এই বৃহৎ জামাতে অংশ নেন হাজারো মুসল্লি।
হঠাৎ প্রকৃতির এমন হানায় একমুহূর্তের জন্যও ভাঙেনি মুসল্লিদের কাতার। মাথায় ছাতা কিংবা পলিথিন, আবার কারও কারও শরীর সম্পূর্ণ ভিজে একাকার, কিন্তু মাঠ ছাড়েননি একজনও। নরসুন্দা নদীতীরের এই প্রাচীন পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা পরম ধৈর্য ও ভক্তিতে বৃষ্টির মধ্যেই শেষ করেন ঈদের নামাজ।
শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিন দফা শটগানের গুলি ফুটিয়ে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ঈদের জামাত।
জামাতের আগে মুসল্লিদের ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ-১ সদর ও হোসেনপুর আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ নিকলী ও বাজিতপুর আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইশতিয়াক ইমন।
শোলাকিয়ার সুদীর্ঘকালের ঐহিত্য অনুসারে জামাত শুরুর ১০ মিনিট আগে তিনটি, পাঁচ মিনিট আগে দু’টি এবং এক মিনিট আগে একটি শটগানের গুলি ফুটিয়ে জামাত শুরুর সংকেত দেওয়া হয়। প্রথম তিনটি গুলি ছোড়েন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
জামাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিপুল সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন ছিল দুই প্লাটুন বিজিবি র্যাব, সিআইডি ও পিবিআই। ব্যবহার করা হয় ড্রোন ক্যামেরা। ছিল পুলিশ ও র্যাবের ওয়াচটাওয়ার, পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসি ক্যামেরা, আর্চওয়ে, মেটাল ডিটেক্টর ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রীয়করণ দল। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। স্কাউট সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বরাবরের মত এবারও দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে রেল মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চলাচল করে শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৬টায় কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। নামাজ শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেন দুটি পুনরায় নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবে।
তবে পশু কোরবানির বিষয় থাকে বলে ঈদুল আজহার জামাতে ঈদুল ফিতরের তুলনায় মুসল্লির সমাগম কম হয়েছে।
নামাজ শেষে মোনাজাতে ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। উপস্থিত মুসল্লিদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদসহ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাফল্য কামনা করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির প্রস্তুতি ও আশপাশের মসজিদে আগেই জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় মুসল্লির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।
এদিকে জামাতকে ঘিরে পাঁচ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মাঠজুড়ে মোতায়েন ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয় আর্চওয়ে, ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও কুইক রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। শান্তিপূর্ণভাবে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
কোরবানির ঈদের ঘরোয়া ব্যস্ততা এবং সকালের গুমোট আবহাওয়া উপেক্ষা করে যাঁরা দূরদুরান্ত থেকে এসেছিলেন, এই বৃষ্টি যেন তাঁদের ঈদের স্মৃতিকে আরও স্মরণীয় করে রাখল। গাইবান্ধা থেকে আসা মধ্যবয়সী মুসল্লি রফিকুল ইসলাম (৪৫) গা ভেজা অবস্থায় হাসিমুখে বলছিলেন, ‘কোরবানির ঈদে সকালে ঘরে কত কাজ থাকে, তা তো সবাই জানে। সব ফেলে শোলাকিয়ার টানে গতকাল রাতে আসছিলাম। নামাজের এক রাকাত হওয়ার পর যখন ঝুম বৃষ্টি নামল, ভাবলাম এটা আল্লাহর রহমত। একটা মানুষও কাতার ছেড়ে নড়েনি, আমিও দাঁড়িয়ে রইলাম। এই ভিজা গায়ে নামাজ পড়ার শান্তি সারা জীবন মনে থাকবে।’
নেত্রকোনা থেকে আসা তরুণ মুসল্লি সাকিব আহমেদ রোমাঞ্চিত কণ্ঠে বলেন, ‘বাড়িতে কোরবানি আছে, দ্রুত ফিরতে হবে। তবে আজকের এই অভিজ্ঞতা অদ্ভুত। প্রথম রাকাত নির্বিঘ্নে পড়লাম, আর দ্বিতীয় রাকাতের সময় শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। শোলাকিয়ায় নামাজ পড়ার ইচ্ছা ছিল, আর প্রকৃতি সেটাকে স্মরণীয় করে দিল।’
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ ঈদের জামাতের মোনাজাতে প্রাচুর্য অর্থ প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করতেন। অন্য একটি মতে, সেই দিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার, অর্থাৎ সোয়া লাখ লোক জমায়েত হয়। ফলে ‘সোয়া লাখ’ থেকেই ‘শোলাকিয়া’ নামটি চালু হয়ে যায়। পরে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ (মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর ষষ্ঠ বংশধর) ঈদগাহের জন্য ৪ দশমিক ৩৫ একর জমি শোলাকিয়া ঈদগাহে ওয়াক্ফ করেন। প্রায় সাত একর আয়তনের মাঠটিতে ২৬৫টি কাতার রয়েছে।
ঐতিহাসিক ঈদ জামাতে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ আদায় করেন।
সালাউদ্দিন/সাএ