মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৭টা। একটি গ্যাস স্টেশেনর কনভেনিয়ান স্টোরে সবে মাত্র কাজে যোগ দিয়েছেন ৪০ বছর বয়সী প্রবাসী বাংলাদেশী নিলুফার ইয়সামিন পারভিন।
একটু পর দেখেন কেউ একজন বাইরে পার্কিং করে রাখা তার গাড়িটি ভাংচুর করছে। তিনি স্টোর থেকে বের হয়ে কারণ জানতে চাইলেন সেই ব্যক্তির কাছে। স্টোর থেকে বের হওয়াই যেন কাল হলো তার জন্য। হলুদ জামা পরিহিত ও পিঠে ব্যাগ নিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ এক ব্যক্তি দৌড়ে ইয়াসমিনের কাছে গিয়ে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় একটি বাড়ি দিলেন। এতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইয়াসমিন। তারপর একেরপর এক হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয় ইয়াসমিনকে। কিছুক্ষণ পর সেই ঘাতক চলে গেলে স্থানীয়রা খবর দেয় পুলিশে। কিন্তু ততক্ষণে জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরপারে চলে গেছেন ইয়াসমিন।
চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে ফ্লোরিডার ফোর্ট মেয়ার শহরের মার্টিন লুথার কিং বুলেভার্ড এলাকায়। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে ফ্লোরিডার বাংলাদেশী কমিউনিটিতে।
স্থানীয় লি কাউন্টি পুলিশ ঘাতক ৪০ বছর বয়সী রলবার্ট জোয়াচিনকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক মাইল দূরে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলেই তাকে স্থানীয় লি কাউন্টি জেলে পাঠানো হয়েছে। জেল রেকর্ড অনুযায়ী তার স্থায়ী কোনও ঠিকানা নেই। তাকে ট্রানজিয়েন্ট বা ভবঘুরে হিসেবে তালিকাভূক্ত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সেটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সিসিটিভি ফুটেজে ঘাতক রলবার্টকে প্রথমে একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পরে তিনি সেখানে পার্কিং করে রাখা একটি এসইউভি কারের সামনের গ্লাস ও দুপাশের উইন্ডশিল্ড ভেঙ্গে ফেলেন। ঠিক তখনই স্টোর থেকে বের হয়ে আসেন ইয়াসমিন নামে এক নারী। ইয়াসমিন অঙ্গভঙ্গি করে গাড়ি ভাঙ্গার কারণ জানতে চাইছিলেন। তখনই দৌড়ে ঘাতক রলবার্ট তার কাছে যায়।
এবং মুহুর্তেই তার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। প্রথম আঘাতের পরই ইয়াসমিন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে ঘাতক রলবার্ট তার মাথায় ও বুকে আরো আঘাত করতে থাকে। আঘাত শেষে সে বিপরীত দিকে দৌড়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলাকারীর পরনে ছিল হলুদ রঙের গ্রাফিক টি-শার্ট, কালো শর্টস, হলুদ বা কমলা রঙের জুতা এবং তার সঙ্গে একটি ব্যাকপ্যাক ছিল। পুলিশ ও স্থানীয় বাংলাদেশী কমিউনিটির বাসিন্দারা বলছেন, নিহত ইয়াসমিন স্থানীয় ডি এন্ড ডি কনভেনিয়ান স্টোরে কাজ করতেন। তার গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার ১৮ নং কুশাখালী ইউনিয়নে। তিনি ১৮ নং কুশখালী ইউনিয়েনর চেয়ারম্যান সালাহ উদ্দিন মানিকের ছোট বোন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়েই ফ্লোরিডায় বাস করতেন তিনি।
ফ্রেডরিক অ্যাশলি নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফ্লোরিডার স্থানীয় গণমাধ্যম উইনিক নিউজকে বলেন, তিনি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি এসে একজন ব্যক্তিকে সেখান থেকে চলে যেতে দেখেন এবং পরে একজন নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন ওই নারী ঘুমিয়ে আছেন, কিন্তু পরে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন।
দোকানটির ব্যবস্থাপক উইনিক নিউজকে জানিয়েছেন, নিহত নারী সেখানে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে চিনতেন এবং নিয়মিত দোকানে আসা-যাওয়ার মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার পর পুলিশ ব্যাপক অভিযান চালায়। স্থানীয় বাসিন্দা জাভোনা ওয়েন্স জানান, হেলিকপ্টার এবং বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস রয়েছে এমন এক ব্যক্তি একটি হাতুড়ি নিয়ে দোকানে প্রবেশ করে ওই নারীকে আক্রমণ করে। তদন্তকারীরা জানান, হামলার আগে সন্দেহভাজন ব্যক্তি দোকানের বাইরে পার্ক করা একটি গাড়িতে ভাঙচুর চালায়।
পুলিশ বলছে, এটি এখনো একটি চলমান তদন্ত। হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
