বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চাকরির প্রবিধানমালা ১৯৮৯ এর বিধিমালা অনুযায়ী বিপিসিতে কর্মরত সকল কর্মকর্তা কর্মচারির নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রদান করার বিধান রয়েছে।
কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিপিসি কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতিত্বের কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপিসি প্রবিধানমালা লংঘন করে কোনো কোনো কর্মকর্তার পদোন্নতিসহ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এর একান্ত সচিব আহমদ উল্লাহ অন্যতম।
আহমদ উল্লাহ বিপিসিতে ২০১৯ সালে ক্ষমতাধর ও তার নিজ জন্মভূমি বরিশালের বাসিন্দা চেয়ারম্যান শামসুর রহমানের মাধ্যমে নিয়োগ পান । চেয়ারম্যানের একমাত্র মেয়ের প্রাইভেট টিউটর ছিলেন আহমদুল্লাহ।এতে তার কপাল খুলে যায়। আর সেই সুযোগে লুফে নেন বিপিসির উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) পদের সোনার চাকরি। যেখানে বিপিসির প্রবিধান মালা লংঘন করে এবং নিজ জেলা পরিষদের ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার দিবাকর কাঠি গ্রামে হওয়া সত্ত্বেও পরিচয় গোপন করে ঢাকা জেলার কোটা দিয়ে চাকরি নেন । আহমাদুল্লাহর শশুর স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পিএস ছিলেন।
সেই সুবাদে পিএস পদে কি কি মজা আছে সেটার বিষয় তিনি আগে থেকেই জানতেন বলে বিপিসির প্রবিধানমালাকে থোড়াই কেয়ার না করে সহকারী ব্যবস্থাপক পিএস পদ উপব্যবস্থাপক পদের নিচের পদ হওয়া সত্বেও সেটাই দখল করে আছেন বছরের পর বছর। আহমাদুল্লাহ শুধু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সাথে থেকে সুবিধা নেন নাই বিপিসিতে চাকরির ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নথুল্লাবাদ ইউনিয়ন শাখার প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করেছেন। আওয়ামী প্রভাবেই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে শত শত কোটি টাকার পাহাড় বানিয়েছেন তিনি। তিনি দীর্ঘদিন চেয়ারম্যানের পিএস থাকায় দুর্নীতির আতুর ঘর বানিয়ে অনৈতিকভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ, বিপুলপরিমাণ স্বর্ণালংকার, ঢাকার মিরপুরসহ কয়েকটি জায়গায় রয়েছে ফ্ল্যাট। গ্রামে ডুপ্লেক্স বাড়ি, ঢাকার মিরপুরে দুটি রেস্টুরেন্ট, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ারসহ নামে বেনামে গড়েছেন অঢেল সম্পত্তি। তার ক্ষমতার দাপটএতই যে দুর্নীতির দায়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ এই দুর্নীতিবাজ পিএসকে বিপিসি সূত্র নং ২৮. ০৩. ০০০০. ০১০. ০২. ০১২. ২১/১১৩: তারিখ ০৩/১০/২০২১ এর অফিস আদেশ এর আলোকে বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে হিসাব বিভাগে বদলি করলেও একদিন পরই সেই অফিস আদেশ বাতিল করে আহমাদুল্লাহ সপদে থেকে যান।
এছাড়া বিপিসির চেয়ারম্যান এবং পরিচালকদের গাড়িগুলো ব্যবহার করেছেন তিনি ব্যক্তিগত ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। যেখানে তিনি গাড়ির পদাধিকারপ্র ভুক্ত কর্মকর্তা নন। তার ব্যবহারকৃত গাড়ির নাম্বার ঢাকা মেট্রো- গ ১১-৩২৬২. ৯৬১৪। তিনি এতই ভয়ঙ্কর যে তার বিরুদ্ধে কেউ যদি কথা বলে তাকে বদলিসহ চাকরি থেকে বিতাড়িত করেন। বিতাড়িত করেছেন বিপিসি ঢাকা রেস্ট হাউসের ইনচার্জ মোহাম্মদ শফিউল ইসলামকে। আর সে পদেই দায়িত্ব দিয়েছেন বরিশালের মনিরুজ্জামান সহকারী ব্যবস্থাপক পি ও পি এল সি কে।
বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউস বিপিসির লিয়াঁজো ও অফিস সহ বিপিসির অধীনস্ত কোম্পানির ডিপোতে আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীদের চাকরি দিয়ে সবকিছু তার তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। বিপিসি লিয়াঁজো ও অফিসে স্থায়ী ও অস্থায়ী সব স্তরের লোকদের রেখেছেন তার অঞ্চল বরিশালের। যাতে করে তার অন্ধকার সাম্রাজ্যে কেউ ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে তার ফুপাতো ভাই মিরাজ রয়েছেন পদ্মা অয়েল পি এল সির বরিশাল বার্থ ডিপোতে।
পিএস আহমদ উল্লাহ এর ক্যাশিয়ার ও বিপিসির অথর্ব কর্মকর্তা আশিক শাহরিয়ার এর মাধ্যমে বিভিন্ন ডিপো ও পার্টির কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে থাকেন । তিনি বিপিসির টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, প্রোমোশন বাণিজ্য এর সঙ্গে জড়িত। তিনি বসুন্ধরা ও এস আলম গ্রুপের থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বিটুমিন ডিজেলের মত পণ্য আমদানির অনুমোদন পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিবিসির পিএস আহমাদুল্লাহ এর নামে বিগত দিনেও দুদকে অভিযোগ থাকাকালীন সময়ে উপর মহলকে ম্যানেজ করে তিনি প্রোমোশনের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র নেন।
আহমাদুল্লাহ যোগদানের পর হতে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এবং লোকমুখে উঠে আসে তার বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সচিত্র প্রতিবেদন। আহমাদুল্লাহ বিপিসিতে বিপণন কোম্পানির কর্মকর্তাদের থেকে মোটা অংকের মাসোহারা নিয়ে পদোন্নতি বদলি তদন্ত রিপোর্টে জালিয়াতি করে লক্ষ লক্ষ টাকা দুর্নীতি করেছেন। এছাড়া কোম্পানি সমূহের বার্ষিক ৫% মুনাফার অনুমোদনের ক্ষেত্রে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেন করেছেন।
তিনি বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানিগুলোর ইনচার্জকে বদলি ও হুমকি প্রদান করে মাসোহারা গ্রহণ করেন। তিনি বিপিসির যাবতীয় আপ্যায়ান স্টেশনারি, কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন প্রিন্টার টোনার কালি অফিসের যাবতীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং জয় পাহাড় এস্টেট ও বাংলোর যাবতীয় মেরামত রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বিপিসির আর্থিক ক্ষতি করে নিজের পকেট ভারী করেছেন। কোটি কোটি টাকা কমিশন বাণিজ্য করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি বিল বাবদ বিপিসি থেকে অর্থ নিয়েছেন ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫১ টাকা। এছাড়াও বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল আহসানকে খুশি করার জন্য দৈনিক ভিত্তিতে চাকরি দেয়ার নাম করে এক প্রার্থীর কাছ থেকে দুইটি এসি ও নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন এই আহমাদুল্লাহ। তিনি বিপিসির আর্থিক হিসেবের যাবতীয় দেখাশোনা করতেন। অর্থাৎ বিপিসির ব্যাংক হিসাব এর এফডিআর ও এস এম ডি হিসাবে তার পছন্দনীয় ব্যাংকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়েছেন ।
তিনি বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের একমাত্র সালামের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে এই সালামের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সমূহ বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা এস এন ডি ও এফডিআর হিসেবে জমা করেছিল বর্তমানে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দীর্ঘ দেড় বছর অতিবাহিত হলেও এ সালাম গ্রুপের ব্যাংকের এস এম ডি ও এফডিআর হিসাবে সর্বশেষ জমাকৃত প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা বিপিসি এখনো তুলতে পারেনি। এছাড়া তিনি বেসরকারি এলসি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে এলসির অতিরিক্ত অর্থ জমা রেখে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তিনি বেসরকারি রিফাইনারিগুলো থেকে মোটা অংকের মাসোহারা গ্রহণসহ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দিয়েছেন।আহমাদুল্লাহর সময়ে ইএসপিএন প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপ লাইন প্রকল্প, ইন্ডিয়া বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পসহ বিপিসির চলমান প্রকল্প হতে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য প্রকল্পের জন্য শত শত শ্রমিক কর্মচারী ও অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের লক্ষ লক্ষ টাকা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে
তিনি বেসরকারি রিফাইনারি সমূহ হতে মাসোহারা গ্রহণ করেন ওবিপিসির একমাত্র রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এর যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে প্রতিবছর ৭০-৭৫টি লোকেশন অনুমোদন দিতেন। এতে প্রতি বছর বিপিসি হতে শত কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধন করে যেখানে তিনি মোটা অংকের অর্থ গ্রহণ করতেন। এছাড়া তিনি ইআরএল এর প্রসেসিং ফি হতে মোটা অংকের মাসোহারা ফি গ্রহণ করতেন। আহমাদুল্লাহ এর এইসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্মারক নং -০০. ০১. ২৬০০. ৬০৩. ০১. ০০৮. ২৪/১১২৮৭ তারিখ ২০/০৩/২০২৪ এর আলোকে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা থাকলেও সেটা আর আলোর মুখ দেখেনি। কারণ তিনি তৎকালীন স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের মদদ পুষ্ট হয়ে রাজনৈতিক নেতা এবং ক্ষমতার মাধ্যমে তা ম্যানেজ করেছেন। আরো অবাক করা বিষয় হচ্ছে, সরকারের কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর বদলির বিধান থাকলেও তাকে সাত বছরের অধিক সময় হলেও বদলি করা সম্ভব হয়নি।
