ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে জীবন-মৃত্যুর অনিশ্চয়তায় কাটানো দিনগুলোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন দেশে ফেরা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হক ও লুৎফুর রহমানসহ কয়েকজন তরুণ সম্প্রতি দেশে ফিরে সেই স্মৃতি তুলে ধরেন।
নুরুল হক জানান, ইরানের আকাশে সারাক্ষণ যুদ্ধবিমানের আনাগোনা ছিল। “কে বাঁচবে, কে মরবে—এটা বলা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে রাতে বোমা বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক আরও বেড়ে যেত,” বলেন তিনি। দিনের বেলা কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যা নামলেই শুরু হতো ভয়ের রাত।
ছয় বছর আগে ইউরোপে যাওয়ার আশায় ওমান হয়ে ইরানে পাড়ি জমান নুরুল হক। সেখান থেকে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থানের পর যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই দেশে ফেরেন তিনি। তার ভাষায়, “দূর থেকে অনেকেই মনে করেন ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে সব জায়গায় এমন অবস্থা নয়। তবে আতঙ্ক ছিল সবসময়।”
অন্যদিকে লুৎফুর রহমান জানান, রাজধানী তেহরান-এ অবস্থানকালে তিনি সরাসরি বোমা হামলার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। “হঠাৎ বিকট শব্দ, চারপাশ কেঁপে ওঠা, মাথার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল,” বলেন তিনি।
তিনি আরও জানান, হামলার সময় ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইরে বের হওয়ার সুযোগ ছিল না, খাবারের সংকট তৈরি হয়। “শুধু রুটি খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়,” বলেন তিনি।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে যখন চারপাশে লাগাতার হামলা চলতে থাকে। “কখন মিসাইল এসে পড়বে—এই ভয়ে দিন কাটত,” বলেন লুৎফুর রহমান।
একপর্যায়ে বাংলাদেশ দূতাবাস তেহরান প্রবাসী বাংলাদেশিদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। দূতাবাসের সহায়তায় তাদের সাভেহ শহরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।
লুৎফুর রহমান জানান, দূতাবাসের সহযোগিতায় ১৮৬ জন বাংলাদেশি ট্রাভেল পাস পান। পরে তারা বাসে করে আস্তারা সীমান্তে পৌঁছান। তবে সেখানে পৌঁছে নতুন বিপদের মুখে পড়েন তারা। গভীর রাতে তীব্র শীতের মধ্যে সীমান্তে কোনো কর্মকর্তা না থাকায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হয়।
“তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কারও কাছে কম্বল ছিল না। ভয় আর শীত—দুটো মিলিয়ে ভয়াবহ রাত কেটেছে,” বলেন তিনি।
পরদিন সকালে আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা বাকু পৌঁছান। সেখান থেকে বিশেষ ফ্লাইটে দেশে ফেরেন তারা।
এভাবে প্রায় ২০০ বাংলাদেশি একই প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরেছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে নবীগঞ্জের আরও দুই তরুণ—সোহেলসহ কয়েকজন রয়েছেন।
প্রবাসফেরতদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকা ছিল এক কঠিন লড়াই। তবে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা ও দূতাবাসের তৎপরতায় তারা নিরাপদে দেশে ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
