শুক্রবার , ৮ মে ২০২৬
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. তথ্য-প্রযুক্তি
  7. বিনোদন
  8. মতামত
  9. সর্বশেষ
  10. সারাদেশ

মাছের আকালে বন্ধ ৬৫০ মহাল, বেকার ২০ হাজার শ্রমিক

ঢাকা ইনফো২৪
মে ৮, ২০২৬ ৪:২১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বৈশাখের রোদ যেন আগুনের হলকা ছুড়ে দিচ্ছে কক্সবাজারের নাজিরারটেকের বুকে। আকাশে মেঘের চিহ্নটুকু নেই, বাতাসে লবণের গন্ধ, আর মাটি ফেটে যাওয়ার উপক্রম। শুঁটকি উৎপাদনের জন্য এ রকম আবহাওয়া স্বর্গীয়। কিন্তু নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লিতে এই মুহূর্তে কোনো উৎসব নেই। বাঁশের মাচায় ঝুলন্ত মাছের সারি নেই, নেই শ্রমিকদের ব্যস্ত পদচারণ। ৭০০ মহালের মধ্যে অন্তত ৬৫০টি এখন নিথর, নিস্তব্ধ। শুধু রোদ পুড়ছে- খালি বাঁশে, খালি মাচায়, আর অপেক্ষারত শ্রমিকের মুখে। কারণ একটাই- মাছ নেই।

শুঁটকি ব্যবসায়ীরা বলেন, গ্রীষ্মের তীব্র খরতাপ শুঁটকি তৈরির আদর্শ সময়। কড়া রোদে মাছ দ্রুত শুকায়, মান ভালো হয়, উৎপাদন খরচও কম পড়ে। অক্টোবর থেকে মে- এই সাত মাস শুঁটকির মৌসুম হলেও মার্চ থেকে মে মাসের রোদকে বলা হয় ‘সোনার রোদ’। কিন্তু এ বছর সেই সোনার রোদ কাজে লাগছে না।

গত ১৫ এপ্রিল থেকে সরকার সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। প্রজনন মৌসুমে মাছের বংশ রক্ষায় প্রতিবছরই এই নিষেধাজ্ঞা আসে। অন্যান্য বছর মহালমালিকেরা আগেভাগে মাছ মজুত করে রাখেন, ফলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উৎপাদন চলে কিছুটা। কিন্তু এ বছর সে সুযোগ হয়নি- কারণ গত আট মাস ধরেই কক্সবাজার উপকূলে মাছের আকাল চলছে।

কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আগে ট্রলার ফিরলেই জালভর্তি মাছ আসত। সেই মাছের বড় অংশ সরাসরি চলে যেত মহালে। এখন ট্রলার ফেরে প্রায় খালি হাতে। গত আট মাসে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে নিষেধাজ্ঞার আগে মহালমালিকেরা মাছ মজুত করতে পারেননি।’

ফলে নাজিরারটেকের ৭০০ মহালের মধ্যে মাত্র ৫০-৬০টিতে এখন কোনোরকম উৎপাদন চলছে- সেটাও বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছ দিয়ে।

ভরদুপুরে একটি মহালের ভেতর মাটিতে বসে কাঁচা মাছ বাছাই করছিলেন মায়েশা বেগম। মাথায় ঘাম, হাতে আঁশটে গন্ধ, মুখে ক্লান্তির ছায়া। তবু থামার উপায় নেই। সকাল ছয়টায় শুরু, সন্ধ্যা ছয়টায় শেষ- টানা বারো ঘণ্টার খাটুনিতে মেলে পাঁচশো টাকা। তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, এমনিতেই কাজ নেই, তার ওপর খাব কী?

মায়েশার বাড়ি মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের ধলঘাইট্যা পাড়ায়। বারো বছর আগে স্বামী মারা যান। চার সন্তান নিয়ে টিকতে না পেরে চলে আসেন নাজিরারটেকে। প্রথম দুই বছর ভাড়া বাসায়, তারপর থেকে সরকারি খাসজমিতে টিনের ঘর বেঁধে আছেন। বারো বছর ধরে এই শুঁটকিমহালই তার সংসারের একমাত্র অবলম্বন। সাত জনের সংসারে পাঁচশো টাকার হিসাব মেলানো যে কতটা কঠিন, সেটা মায়েশার চোখের ভাষাই বলে দেয়।

একটু দূরে বসে মাছ বাছাই করছিলেন সামছুন্নাহার। বয়স চল্লিশের কোঠায়। স্বামী আবদুস শুক্কুর একসময় ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালাতেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি অসুস্থ, উপার্জন নেই। সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে শুঁটকিমহালে এসেছেন সামছুন্নাহার।

তিনি বলেন, সারা দিন কাজ করে পাঁচশো টাকা পাই। অসুস্থ স্বামীর ওষুধ কিনলে খাবারের টাকা থাকে না। জানুয়ারিতে মেয়ের স্কুলে পাঁচ হাজার টাকার ভর্তি ফি দিতে পারেননি। মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরারটেকের শুঁটকিপল্লির প্রায় ৯৫ শতাংশ শ্রমিকই জলবায়ু উদ্বাস্তু। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের বহু মানুষ ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি সব হারিয়ে ফেলেন। তাদের একটি বড় অংশ আশ্রয় নেন নাজিরারটেকে, আর টিকে থাকার জন্য বেছে নেন শুঁটকিমহালের শ্রম। তিন দশক পেরিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম বড় হয়েছে, কিন্তু বিকল্প কোনো জীবিকার পথ তৈরি হয়নি। শুঁটকিমহালই তাঁদের একমাত্র ঠিকানা।

পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, ‘শুঁটকির উৎপাদনের ভরা মৌসুমে মহাল বন্ধ থাকার মতো দুর্ভোগ আর কী হতে পারে? এখানকার বিশ হাজারের বেশি শ্রমিকের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই নারী। এরা সবাই প্রান্তিক, ভঙ্গুর। মহাল বন্ধ মানে তাদের সংসারে চুলা বন্ধ।’

পরিসংখ্যান বলছে, এই সংকট শুধু এই মৌসুমের নয়, এটি একটি ধারাবাহিক অবনতির চিত্র।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) কক্সবাজারে মোট শুঁটকির উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন, অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় চার হাজার টন। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) উৎপাদন হয়েছে ৩১ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি- মাসিক গড় নেমে এসেছে ৩ হাজার ৮০০ টনে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রে মাছের বিচরণ ও প্রজনন ধরন বদলে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় মৎস্য আহরণে, আর সেই প্রভাব গিয়ে আঘাত করছে শুঁটকিশিল্পে। কেন উৎপাদন কমছে তার অনুসন্ধান চলছে।’

সংকটের এই সময়ে কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সড়কে শুঁটকির চল্লিশটিরও বেশি দোকানে বিক্রি থেমে নেই। তবে বিক্রি হচ্ছে মূলত পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পুরোনো শুঁটকি হিমাগারে রাখা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেড় থেকে দুই বছর পুরোনো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানকর্মী জানান, এই বিদেশি শুঁটকিই ‘কক্সবাজারের তাজা শুঁটকি’ বলে পর্যটকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। পর্যটকেরা সাধারণত গুণমান যাচাই করতে পারেন না, সে সুযোগও নেন না। ফলে প্রতারণাটা চলছে অবলীলায়। স্থানীয় শুঁটকির সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

বাজারে এখন প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি বিকোচ্ছে ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, লইট্যা ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯০০, লাক্ষ্যা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৮০০, কোরাল ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। ক্রেতা পণ্য পাচ্ছেন, কিন্তু পাচ্ছেন না মান কিংবা ন্যায্য দাম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে জুনের মাঝামাঝিতে। তারপর জেলেরা ট্রলার নিয়ে সাগরে নামবেন। মাছ এলে মহাল চলবে, শ্রমিকদের হাতে কাজ আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাগর কি আগের মতো মাছ দেবে? গত আট মাসের ধারা সে আশার পথে বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে রেখেছে।

ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘শুঁটকির উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এখন নিষেধাজ্ঞা এমন সময়ে পড়েছে, যখন রোদ সবচেয়ে ভালো। এই ক্ষতি পোষানো কঠিন।’



কুশল/সাএ

ঢাকা ইনফো২৪

ঢাকা ইনফো২৪ (DhakaInfo24) একটি বাংলাদেশভিত্তিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে সর্বশেষ ব্রেকিং নিউজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং লাইফস্টাইল বিষয়ক আপডেট নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। দ্রুত, নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানই ঢাকা ইনফো২৪-এর মূল লক্ষ্য। আধুনিক সাংবাদিকতার মান বজায় রেখে পাঠকদের জন্য সর্বশেষ খবর সহজ ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।