
কেমিস্ট খন্দকার আব্দুর রহমান
কেমিস্ট খন্দকার আব্দুর রহমান গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার তরগাঁও গ্রামের সম্ভ্রান্ত খন্দকার পরিবারের সন্তান। শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য, সমাজসেবা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সমন্বয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন আস্থাভাজন ও মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
আজ প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে এক সুপরিচিত নাম খন্দকার আব্দুর রহমান। দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্মময় জীবনে তিনি যেমন অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, তেমনি প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কল্যাণে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
১৯৬৩ সালের আগস্ট মাসে জন্মগ্রহণ করা খন্দকার আব্দুর রহমান ছিলেন মরহুম খন্দকার হাফিজ উদ্দিন সাহেবের কনিষ্ঠ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। তার শিক্ষাজীবনের শুরু তরগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে তিনি ভর্তি হন স্বনামধন্য কাপাসিয়া সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনেই তিনি অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জনের পাশাপাশি উচ্চ মাধ্যমিকে পাঁচ বিষয়ে লেটার মার্কস পেয়ে এলাকায় সাড়া ফেলেন।
শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী। বলা হয়ে থাকে, কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে সিনিয়র শিক্ষকরাই তাকে ইংরেজি বা গণিত ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব দিতেন। অনর্গল ইংরেজিতে বক্তৃতা ও বিতর্কে অংশ নেওয়ার দক্ষতা তাকে স্কুলজীবনেই আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। শুধু তাই নয়, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে ভালো ফলাফলের জন্য তিনি একটি ইংরেজি গ্রামার বইও রচনা করেন, যা বহু শিক্ষার্থীকে উপকৃত করেছে।
উচ্চ মাধ্যমিকে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি সরকারি ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বাংলাদেশ কলেজ অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষ করেই তিনি এপেক্স গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে কেমিস্ট হিসেবে যোগদান করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই তার মেধা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্বীকৃতি পায়। নেদারল্যান্ডস সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯৯০ সালে তিনি ইউরোপে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। সেখানে The Netherlands Organisation for Applied Scientific Research (TNO)-তে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে ইউরোপের বিভিন্ন খ্যাতনামা কেমিক্যাল শিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুক্তরাজ্যের BASF এবং জার্মানির Bayer কোম্পানিতে তার প্রশিক্ষণ ও কাজের অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৯২ সালে স্ত্রী মিসেস নার্গীস রহমান তার সঙ্গে ইউরোপে যোগ দিলে তিনি আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করেন। বেলজিয়ামের Vrije Universiteit Brussel (VUB) থেকে মাস্টার্স অব হিউম্যান ইকোলজি এবং পরবর্তীতে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব লোভেন থেকে থিওলজিতে MBA সম্পন্ন করেন।
শুধু পড়াশোনা বা পেশাগত সাফল্যেই তিনি সীমাবদ্ধ থাকেননি। ছাত্রজীবন থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। International Student Organisation of Leuven (ISOL)-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি বেলজিয়ামে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পরিবারগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলেন। জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিশেষ করে নবাগত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বেলজিয়ামে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বাংলাদেশে নিযুক্ত বেলজিয়ান দূতাবাসের সঙ্গে সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর ভিসা ও ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ করতে সহায়তা করেন। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র ফি জমা দিয়ে কিংবা পরে ফি পরিশোধের সুযোগ সৃষ্টি করেও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করেছেন। তার এই নিঃস্বার্থ সহযোগিতায় অসংখ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ইউরোপে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন এবং পরবর্তীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
১৯৯৩ সালে তিনি পর্তুগালে মাইগ্রেশনের জন্য আবেদন করেন। ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পর্তুগালের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, নতুন অভিবাসীদের সহায়তা এবং কমিউনিটির উন্নয়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়।
২০০৮ সালে স্বপরিবারে স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর আগ পর্যন্ত তিনি বছরের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে কাটাতেন। দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ও টান ছিল সবসময় গভীর। পর্তুগিজ নাগরিকত্ব অর্জনের পর ২০০৯ সাল থেকে তিনি যুক্তরাজ্যের West London National Health Service (NHS)-এ সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
পাঁচ ভাষায় দক্ষ এই প্রবাসী বাংলাদেশি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমানে তিনি “লন্ডন বাংলাদেশি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন” এবং “বৃহত্তর ঢাকা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, যুক্তরাজ্য”-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনা জাগ্রত করতে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছেন।
একইসঙ্গে যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনীতিতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ২০২২ সালের স্থানীয় নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হিসেবে ইলিং কাউন্সিলের সাউথহল এলাকায় কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার দীর্ঘদিনের সামাজিক কর্মকাণ্ড ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের কারণে স্থানীয় জনগণের মধ্যেও তিনি আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বর্তমানে তিনি নরউড গ্রিন ও সাউথহল গ্রিন ওয়ার্ডের ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ২০২৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে সাউথহল গ্রিন ওয়ার্ড থেকে কনজারভেটিভ পার্টির মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচিত হলে তিনি স্থানীয় জনগণের কল্যাণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা, অপরাধ ও সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড দমন, যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা, বাসস্থান সংকট নিরসন এবং বয়স্কদের জন্য বিনোদন ও মিলনায়তনের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটির উন্নয়নেও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
কেমিস্ট খন্দকার আব্দুর রহমানের জীবন সংগ্রাম, শিক্ষা অর্জন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং মানবিক কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। গাজীপুরের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি কমিউনিটির জন্য কাজ করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গর্বের বিষয়।
গাজীপুরের এই কৃতি সন্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে আরও সফলতা কামনা করছেন তার শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের বিশ্বাস, মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে আগামী দিনেও আরও বড় পরিসরে অবদান রাখার সুযোগ এনে দেবে।