২৩ জুন পলাশী দিবস। বাঙালির ইতিহাসে এই দিনটি পরাধীনতার সূচনালগ্নের এক বেদনাবিধুর স্মারক। জাতীয় জীবনে এর তাৎপর্য শুধু অতীত স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় চেতনার প্রশ্নেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বছরের পলাশী দিবস পালন উপলক্ষে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় একজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ জনমনে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ নন। তারা রাষ্ট্র ও সমাজের ঘটনাপ্রবাহ জনগণের সামনে তুলে ধরেন। ফলে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাংবাদিকের ওপর হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তা শুধু একজন সংবাদকর্মীর ওপর আক্রমণ নয়, বরং গণতান্ত্রিক চর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া। অনেক সময় দেখা যায়, ঘটনার পর বিভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো ঘটনার নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়া বা বিকল্প বয়ান নির্মাণের চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে মূল রাজনৈতিক বার্তা আড়ালে চলে যায় এবং প্রতিপক্ষ নতুনভাবে আক্রমণের সুযোগ পায়।
বর্তমান সময়ে পতিত ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগ
ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে যে জনমত ও আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তার অন্যতম শক্তি হলো নৈতিক অবস্থান। সেই নৈতিক অবস্থানকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আরও সংবেদনশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। সাংবাদিক নির্যাতনের মতো ঘটনা যদি যথাযথভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তাহলে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য থেকে জনগণের দৃষ্টি সরে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উচিত ঘটনাটির জন্য স্পষ্টভাবে দুঃখ প্রকাশ করা এবং প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা চাওয়া কোনো রাজনৈতিক পরাজয় নয়; বরং এটি নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ। একটি রাজনৈতিক দল তখনই জনগণের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে, যখন তারা ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করে।
বিশেষভাবে বলা যায়, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান যদি নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান এবং ঘটনার জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন, তাহলে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এতে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিই সম্মানিত হবেন না, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক সৌজন্য ও মানবিকতার বার্তাও সমাজে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা ও অস্বীকারের সংস্কৃতির পরিবর্তে সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা ও আত্মসমালোচনার চর্চা জরুরি। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে সেটি কেবল একটি বিতর্কের অবসান ঘটাবে না; বরং গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথচলাকেও আরও সুদৃঢ় করবে।
ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, শক্তির চেয়ে নৈতিকতার স্থায়িত্ব বেশি। আর সেই নৈতিকতার প্রথম শর্ত হলো ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহস। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সেই সাহস দেখাতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনার বিজয়।
লেখক: ✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com
