১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধ উপমহাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধু একটি যুদ্ধ নয়; বরং একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সম্মিলিত ফল, যার মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন শাসনের অবসান ঘটে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। কৃষি উৎপাদন, মসলিনসহ সূক্ষ্ম বস্ত্রশিল্প, নদীনির্ভর বাণিজ্য এবং রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতার কারণে বাংলা ইউরোপীয় বণিকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এই সমৃদ্ধিই একসময় বিদেশি শক্তির লোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যার লক্ষ্য ছিল বাংলার অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দখল করা।
এই সময়ে বাংলা বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর দৌহিত্র নবাব মনসুর উল-মুল্ক সিরাজ উদ্দৌলা শাহ কুলী খান মির্জা মুহম্মদ হয়বৎ জঙ্গ বাহাদুর বা সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। তরুণ নবাব ক্ষমতায় এসে উপলব্ধি করেন যে, কোম্পানি নিয়ম ভঙ্গ করে করমুক্ত বাণিজ্য, দুর্গ নির্মাণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করছে। তিনি এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ১৭৫৬ সালে কলকাতা দখল করেন। এতে ব্রিটিশরা প্রতিশোধমূলক ও কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র গড়ে তোলে। এই ষড়যন্ত্রে বাংলার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সামরিক কর্মকর্তা, বিশেষ করে মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, জগৎ শেঠ প্রমুখ যুক্ত হন। তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা। এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনই বাংলার রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের বাহিনী সংখ্যায় অনেক বেশি ছিল। তবে প্রকৃত যুদ্ধের চেয়ে এটি ছিল রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার একটি উদাহরণ। যুদ্ধের সময় মীর জাফরের বাহিনী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ না করায় নবাবের সেনারা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ক্লাইভ কৌশলগতভাবে পরিস্থিতির সুযোগ নেয় এবং খুব সহজেই যুদ্ধের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে। এই যুদ্ধ ছিল প্রকৃত অর্থে একটি “নির্ধারিত পরাজয়”, যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা প্রধান ভূমিকা পালন করে।
পলাশীর পর বাংলার শাসনব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর মীর জাফরকে নবাব বানানো হলেও প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় কোম্পানির হাতে। ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজস্ব ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করে। এর ফলে বাংলার অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে ঔপনিবেশিক শোষণ শুরু হয়।
এই শোষণের ফলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধ্বংসের পথে যায়, কৃষকরা অতিরিক্ত করের চাপে বিপর্যস্ত হয় এবং সম্পদ ব্যাপকভাবে ইউরোপে পাচার হতে থাকে। একসময়ের সমৃদ্ধ বাংলা ধীরে ধীরে দারিদ্র্য ও অনুন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়। পলাশী তাই কেবল একটি সামরিক পরাজয় নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সূচনা।
পলাশীর ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়; জাতীয় ঐক্যের অভাব একটি রাষ্ট্রের পতনের প্রধান কারণ হতে পারে। এখানে বাহ্যিক শক্তির চেয়ে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বিশ্বাসঘাতকতা বেশি ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। যখন রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তিগুলো ব্যক্তিগত স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়, তখন বহিঃশক্তির আধিপত্য সহজ হয়ে যায়।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা থেকেই “আর কোনো পলাশী নয়” একটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হলো, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো ধরনের বিভাজন, ষড়যন্ত্র বা স্বার্থপরতা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার, যেখানে দেশপ্রেম, ঐক্য এবং দায়িত্ববোধকে সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, ঐক্যবদ্ধ জাতি যেকোনো শক্তিকে পরাজিত করতে পারে। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে সতর্ক করে দেয় যে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা আরও কঠিন। আধুনিক বিশ্বে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক চাপ এবং বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে সার্বভৌমত্ব রক্ষা একটি চলমান চ্যালেঞ্জ।
অতএব, পলাশী দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন, শিক্ষা গ্রহণের দিন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রতিজ্ঞা করার দিন। “আর কোনো পলাশী নয়” এই আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জাতীয় ঐক্য, সততা ও দেশপ্রেমই একটি রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী ও সার্বভৌম রাখতে পারে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা—উপমহাদেশের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ও পরস্পর-সংযুক্ত ঘটনা। একটির মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ সশস্ত্র প্রতিরোধ দেখা যায়, আর অন্যটির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও শোষণ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কঠোর করনীতি, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং স্থানীয় জনগণ ও সৈন্যদের প্রতি অবমাননাকর আচরণ এই বিদ্রোহের ভিত্তি তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের বিষয়, বিশেষ করে নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ নিয়ে গুজব, যা হিন্দু ও মুসলিম সিপাহিদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে। বিদ্রোহ প্রথমে সিপাহিদের মধ্যে শুরু হলেও দ্রুত তা দিল্লি, কানপুর, লখনৌসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি বৃহৎ জনআন্দোলনের রূপ নেয়। যদিও শেষ পর্যন্ত এটি ব্যর্থ হয়, তবে এর পরিণতিতে ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি ভারত শাসন শুরু করে। এই ঘটনা উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনকে আরও সংগঠিত ও কেন্দ্রীভূত করে তোলে।
১৮৫৭ সালের পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশে নতুন রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে, রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে ওঠে। এই ধারাবাহিক বিকাশই পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের ঘটনার পটভূমি তৈরি করে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই বিভাজনের পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া। মুসলিম লীগ নেতৃত্বের মতে, ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা ও প্রতিনিধিত্ব অনিশ্চিত হতে পারে—এই ধারণা থেকেই আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জোরালো হয়। “দ্বি-জাতি তত্ত্ব” এই দাবির আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করে, যেখানে বলা হয় হিন্দু ও মুসলমান দুটি পৃথক জাতি, যাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আলাদা হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বিভিন্ন দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ব্রিটিশ শাসনও দ্রুত উপমহাদেশ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বিভাজন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
তবে এই স্বাধীনতা ছিল একই সঙ্গে বেদনা ও সংকটেরও সূচনা। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটে এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় জনসংখ্যা স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান দুটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল; “পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান” নিয়ে গঠিত হয়, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার জন্ম দেয় এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
এইভাবে দেখা যায়, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম বৃহৎ প্রতিরোধ, আর ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল সেই শাসনের অবসান এবং নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর সূচনা। দুটি ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক চেতনা, বিভাজন এবং সংগ্রামই উপমহাদেশের আধুনিক ইতিহাসকে গঠন করেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বর—এই তিনটি ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। এই সময়কালকে সাধারণভাবে বলা যায় রাষ্ট্রীয় সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের এক জটিল পর্যায়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও প্রাণ হারান। এই ঘটনার মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এক আকস্মিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় সেনাবাহিনীর ভেতরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর অনিশ্চয়তা ও বিভাজন দেখা দেয়।
এরপর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলী—নিহত হন। এই ঘটনা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তোলে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সংকট এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয়।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইন্ধনে তৎকালীন সিজিএস ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর আগষ্ট বিপ্লবের নেপথ্য নায়ক খন্দকার মোস্তাক আহমেদের সরকারের ক্ষমতার আসন থেকে উৎখাত করার জন্য একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। তৎকালিন সেনাবাহিনীর চীফ অফ স্টাফ জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত ও গৃহবন্দি করেন এবং ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চীফ অফ স্টাফ পদে অধিষ্ঠিত হন। এই ঘটনা সেনাবাহিনীর মধ্যে নতুন করে অসন্তোষ দেখা দেয়, পাশাপাশি দেশের মানুষ এটাকে ভালো চোখে দেখেনি। শুরু হয় নতুন প্রেক্ষাপটের।
এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনীর ভেতরের বিভাজন, পাল্টা অভ্যুত্থান এবং সাধারণ সৈনিক ও জনগণের অংশগ্রহণে একটি ব্যাপক আন্দোলন বা অভ্যুত্থান ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। এই সময় তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান লাভ করেন এবং পরবর্তী সময়ে দেশের নেতৃত্বে আসেন।
তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে তিনি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানে সবার জন্য রাজনীতি উন্মুক্ত করে দেন। তারই অংশ হিসেবে ভারতে অবস্থানরত মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনাকে ১৯৮০ সালের ১৭ মে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন।
জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হতে থাকে। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক সামরিক অভ্যুত্থানে দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার শিকার হন। তাঁর শাহাদাতের পর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বিচারপতি আব্দুস সাত্তার নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নতুন করে ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়।
সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তৎকালীন নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে সামরিক আইন জারি করেন। এই সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সরাসরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক বছর সামরিক শাসনের অধীনে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামো পরিচালিত হয়।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলো, ছাত্র সংগঠন, পেশাজীবী গোষ্ঠী এবং সাধারণ জনগণ একত্রিত হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি জোরালো করে।
এরই মধ্যে সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ আওয়ামীলীগের সাথে আঁতাত করে ১৯৮৬ এর জাতীয় নির্বাচন দেয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ফ্রিডম পার্টি সহ কয়েকটি ছোট দলও এতে অংশ নেয়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।
দীর্ঘ আন্দোলন ও ব্যাপক জনঅসন্তোষের ফলে ১৯৯০ সালে পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রবল গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং সামরিক শাসনের অবসান ঘটে।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে। আওয়ামীলীগ শুরু থেকে এই সরকারকে অসহযোগিতা করে আসছিল। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিএনপি প্রতি সমর্থন প্রত্যহার করে কেয়ারটেকার সরকারের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে যোগ দেয়।
১৯৯৬ সালে ষড়যন্ত্রমূলক নীলনকশার নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে।
শুরু হয় প্রতিপক্ষ নির্যাতনের নতুন অধ্যায়।
দেশের আপামর জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এরপর ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় রাজনৈতিক জোট সরকার গঠন করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল ভোটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
আওয়ামীলীগ অতীতের মতো জোট সরকারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। যার ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কম্বিনেশনে সামরিক সহযোগিতায় ওয়ান ইলেভেনের মতো অধ্যায় ঘটে।
আওয়ামীলীগ সামরিক বাহিনী’র সাথে আতাত করে ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মহাজোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়।
ক্ষমতা গ্রহণের পর তারা বিরোধী মত দমনের লক্ষে সকল প্রকার অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে। গোটা তাদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়। গুম খুন সহ সকল প্রকার অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় তারা।
দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে বৈদেশিক রিজার্ভ শুন্যের কোঠায় নিয়ে আসে। বলা যায় ১৯৭৫ এর মতো অঘোষিত একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকার।
দেশের আপামর জনগণ এ থেকে মুক্তির জন্য এক পর্যায়ে রাস্তায় নেমে আসে। শুরু বিপ্লবী পথের নতুন যাত্রা। সকল বাধা অতিক্রম করে ছাত্র জনতা জুলাই বিপ্লব সংগঠিত করে। শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রী পরিষদ, সংসদ সদস্য এমনকি তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত মসজিদের ইমাম পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ শুরু করে এক নতুন সফর। নোবেল বিজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবতীকালিন সরকার দায়িত্ব পালন করে দেশকে একটি জায়গায় নিয়ে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করে।
২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় দল বিএনপি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। এই সময় তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ, সামাজিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি সামনে আসে।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বারবার পরিবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন এবং নির্বাচনী রাজনীতির মাধ্যমে। প্রতিটি পর্যায়ই দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে।
লেখক: ✍🏿 মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
