তিন দশকের আস্থার নাম ‘সাকুরা’: যে গল্পের মহানায়ক উজিরপুরের হুমায়ুন কবির *জিহাদ রানা, বরিশাল প্রতিনিধি*
ঢাকা-বরিশাল দক্ষিণবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বললেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে একটি নাম, সাকুরা পরিবহন’।
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা আর কুয়াকাটার মানুষের কাছে ঢাকা যাওয়ার নিরাপদ ও আরামদায়ক বাহন মানেই সাকুরা। আর এই বিশাল সাম্রাজ্যের পেছনের কারিগর হলেন বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার কৃতি সন্তান আলহাজ্ব মো. হুমায়ুন কবির।
শূন্য থেকে শুরু করে কীভাবে তিনি দেশের অন্যতম সেরা পরিবহন ব্র্যান্ড গড়ে তুললেন, তা এক অনুপ্রেরণার গল্প।
জানাগেছে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হুমায়ুন কবির ছিলেন জাপান প্রবাসী। জাপানের উন্নত প্রযুক্তি এবং তাদের নিয়মানুবর্তিতা তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই মুগ্ধতা থেকেই তিনি দেশে ফিরে পরিবহন খাতে কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। ১৯৯১ সালে তিনি ‘মিৎসুইয়া’ নামে একটি বাস দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও, ১৯৯৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাকুরা পরিবহন’ নামে ব্র্যান্ডিং শুরু করেন। জাপানের জাতীয় ফুল ‘সাকুরা’র নামানুসারে তিনি এই নামকরণ করেন, যা আজ দক্ষিণবঙ্গের ঘরে ঘরে পরিচিত।
আলহাজ্ব মো. হুমায়ুন কবিরের জন্ম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে। তার বাবা মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ ছিলেন ঐ অঞ্চলের একজন সম্মানিত ব্যক্তি।
পারিবারিকভাবেই তারা সততা ও পরিশ্রমের আদর্শে বড় হয়েছেন। বর্তমানে হুমায়ুন কবিরের সুযোগ্য পুত্র মো. হাসিবুর রহমান বাবার এই বিশাল ব্যবসার হাল ধরেছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং অনলাইন টিকেটিং ব্যবস্থায় হাসিবুর রহমানের ভূমিকা সাকুরাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।
অনেকেই মনে করেন সাকুরা কেবল ঢাকা-বরিশাল রুটের বাস। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হুমায়ুন কবির তার সেবার পরিধি বাড়িয়েছেন বহুগুণ, উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল: ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগ ছাড়াও এখন সাকুরা পরিবহন পাবনা, বেনাপোল এবং খুলনা রুটে নিয়মিত সার্ভিস দিচ্ছে।
বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম বা সিলেটের সরাসরি যোগাযোগ সহজ করতেও সাকুরা বিশেষ ট্রিপ পরিচালনা করে থাকে।
পদ্মা সেতু চালুর পর সাকুরা তাদের বহরে যুক্ত করেছে অত্যাধুনিক স্ক্যানিয়া (Scania) এবং হুন্দাই (Hyundai) এসি কোচ। এখন ঢাকা থেকে বরিশাল পৌঁছানো যায় মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টায়।
বর্তমানে সাকুরা পরিবহনে প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ কর্মী সরাসরি কাজ করছেন, যাদের অধিকাংশেরই বাড়ি বরিশাল অঞ্চলে। বরিশালের নথুল্লাবাদ ও রূপাতলীতে রয়েছে তাদের বিশাল টার্মিনাল সুবিধা। এছাড়া উজিরপুরের ইছলাদিতে রয়েছে তাদের নিজস্ব আধুনিক ওয়ার্কশপ এবং ফিলিং স্টেশন, যেখানে বাসের যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি নিশ্চিত করা হয়।
ব্যবসায়ী পরিচয়ের বাইরেও আলহাজ্ব হুমায়ুন কবির একজন দানবীর মানুষ হিসেবে পরিচিত। উজিরপুর ও গৌরনদী এলাকায় বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার নিয়মিত অনুদান রয়েছে। করোনাকালে এবং বিভিন্ন দুর্যোগে সাকুরা পরিবহন ও এর মালিকের পক্ষ থেকে দুস্থদের মাঝে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার নজির রয়েছে।
বরিশালের মানুষের আবেগ আর ভালোবাসার নাম সাকুরা পরিবহন। আলহাজ্ব মো. হুমায়ুন কবিরের দূরদর্শী নেতৃত্ব আর কঠোর পরিশ্রম সাকুরাকে কেবল একটি বাস সার্ভিস নয়, বরং দক্ষিণবঙ্গের উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় এই বিপ্লব আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ যাত্রীদের।
সালাউদ্দিন/সাএ
