এক্সে ‘অ্যামক’ নামের এক ব্যবহারকারী নেহা বোরার একটি ছবি পোস্ট করে দাবি করেন, তিনি অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান। একই পোস্টে নেহাকে জেন-জি প্রজন্মের একজন আইকন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
পোস্টটি পুনরায় শেয়ার করে অভিজিৎ দীপক লেখেন, ‘আমি এর সঙ্গে একমত।’ পরে নেহা বোরা ওই তুলনার প্রতিক্রিয়ায় লেখেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসঙ্গে লড়ি।’
তবে নেহা নিজেই দুজনের তুলনার বদলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এর আগে সিজেপির আন্দোলনের সময় যন্তর মন্তরে এক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি দীপককে বিনয়ী এবং অন্যদের পরামর্শ গ্রহণে আগ্রহী একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের কাছে তিনি নিজেকে তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন ছাত্র ও সহযোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরেন।
আলোচনায় নেহা বোরা
ভারতের ছাত্র রাজনীতিতে পরিচিত মুখ নেহা বোরা সাম্প্রতিক সময়ে আবারও আলোচনায় এসেছেন। এবার দিল্লিতে সমর্থকদের নিয়ে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি।
সোমবার বিকেলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তব্যে নেহা বলেন, ‘দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে।’
বক্তব্য দেওয়ার সময় তার গলা ভাঙা ছিল এবং কথা বলতেও অস্বস্তি হচ্ছিল। নেহা বোরা সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর সভাপতি।
এর এক দিন আগে দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন নেহা। পরে তাকে যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগে টানা দুই দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্যে নেহা বলেন, তার গলা ও শরীরের মতো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং এসআরএফটিআইয়ের অবস্থাও ভেঙে পড়েছে।
নেহার ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়তার শুরু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। সে সময় ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। অভিজিৎ দীপক ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি ওই আন্দোলনে নেহা বোরা আলোচনায় আসেন।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ওই আন্দোলনের সমর্থনে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে অনশনেও অংশ নেন তিনি। এরপর বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকার কারণে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন নেহা।
নেহার নেতৃত্বাধীন আইসা হলো সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়। ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে রাঁচিতে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পরও নেহা আলোচনায় আসেন।
ওই সময় তার মুখে কালি ছোড়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। তবে এতে পিছিয়ে না গিয়ে নেহা বলেন, মুখে কালি ছুড়ে মারলে তিনি ভয় পাওয়ার মানুষ নন। দিল্লির আন্দোলনের সময়ও পুলিশি লাঠিচার্জ ও প্যালেট গানের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানান তিনি।
দিল্লিতে নতুন কর্মসূচি
দিল্লিতে নেহা বোরা ও তার সমর্থকদের বর্তমান দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। তাদের দাবি, এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারাতে পারেন।
এদিকে ভারতীয় সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
বিজেপি সমর্থক পরিবারে বেড়ে ওঠা
নেহা বোরা এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপির সমর্থন রয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পরিবারের রাজনৈতিক মতের সঙ্গে তার অবস্থানের পার্থক্য নিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন সময় মতবিরোধ হয়েছে।
নেহার ভাষ্য, দিল্লিতে আসার পর রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্যও বাড়ে। কখনো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও পড়াশোনা, অর্থনৈতিক বিষয় ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি স্বাধীনতা পেয়েছেন বলে জানান।
নেহার মতে, সিজেপির আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তার বিশ্বাস, ওই আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণরা উপলব্ধি করেছে—একে অপরের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে পাশে দাঁড়ালে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি চান, যন্তর মন্তরের আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া উদ্দীপনা ভোটার তালিকার এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্রের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন, শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়ুক।
নেহার কাছে এসব আন্দোলন আলাদা আলাদা দাবি আদায়ের কর্মসূচি নয়। বরং তিনি এগুলোকে ভারতের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখেন।