
পশ্চিমা গণমাধ্যম
পশ্চিমা গণমাধ্যম বহু বছর ধরে ইসরায়েল নিয়ে একটি মোটামুটি একপাক্ষিক বর্ণনাই দিয়ে এসেছে। তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও আত্মরক্ষার অধিকারের ওপর জোর দিয়েছে, আর ফিলিস্তিনিদের ভোগান্তিকে খুব গুরুত্বহীন ভেবেছে।
৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৭৭,০০০ থেকে ১,০৯,০০০ ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকলেও, এইসব গণমাধ্যম সম্প্রতি মাত্র ইসরায়েলের যুদ্ধনৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে এবং তাদের দীর্ঘদিনের সামরিক সমর্থন থেকে ধীরে ধীরে সরে আসছে।
মাত্র গত সপ্তাহ থেকে ফিনান্সিয়াল টাইমস এবং দ্য ইকোনমিস্ট-এর মতো প্রভাবশালী প্রকাশনাগুলো প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ কৌশল এবং ওয়াশিংটনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রভাবশালী মতামত লেখক থমাস ফ্রিডম্যান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলপন্থী ছিলেন, তিনিও এখন বলছেন, “এই ইসরায়েলি সরকার আমাদের মিত্র নয়” এবং তিনি অভিযোগ করছেন, এটি আমেরিকার আঞ্চলিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একই সপ্তাহে, ফিনান্সিয়াল টাইমস তার এক সম্পাদকীয়তে “গাজা নিয়ে পশ্চিমাদের লজ্জাজনক নীরবতা”কে নিন্দা জানায়। আর দ্য অ্যাটলান্টিক নেতানিয়াহুর প্রতিশ্রুত “পরম বিজয়”কে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূল পরিকল্পনার সঙ্গে তুলনা করে।
দ্য ইকোনমিস্ট ঘোষণা করেছে যে, “এই যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত”। তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দিতে বলেছে।
প্রশ্ন হলো, পশ্চিমা মূলধারার এতগুলো গণমাধ্যমের এই হঠাৎ করে ইসরায়েল বিরোধী কঠোর মনোভাবের প্রকাশের মানে কি সত্যিই আন্তর্জাতিক বক্তব্যে একটি মৌলিক অবস্থান পরিবর্তন ঘটছে?
“নেতানিয়াহু আমাদের বন্ধু নন”
সম্প্রতি পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসরায়েল নিয়ে যে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা নিছক কাকতালীয় নয়।
হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহুর মধ্যে গাজা নীতি ও ইরান ইস্যুতে প্রকাশ্য বিরোধ, ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে অগ্রগতির অভাব এবং রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি—এসব কিছুই এই নতুন সম্পাদনা নীতির ভিত্তি। এখন ইসরায়েলের ৬০ শতাংশের বেশি জনগণ নতুন স্থল অভিযান ও রিজার্ভ সেনা ডাকের বিরোধিতা করছে।
বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা বিপুল হারে বাড়তে থাকায়, অনেক সম্পাদক ইসরায়েলের গাজা অভিযানে “গণহত্যা” শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
বিবিসি উল্লেখিত এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে মাত্র ৪৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন—গত ২৫ বছরে যা সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনপন্থীদের সমর্থন বেড়ে হয়েছে ৩৩ শতাংশ, যা নজিরবিহীন।
এই গণমাধ্যমগত অবস্থান পরিবর্তন এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শালোম লিপনারের ফোরেন পলিসি নিবন্ধে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু এখন এমন এক “রাজনৈতিক মাইনফিল্ডে” আটকা পড়েছেন, যেখানে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান দলই মূল নিয়ন্ত্রক। ট্রাম্প তার মধ্যপ্রাচ্য সফরে ইসরায়েলকে উপেক্ষা করেছেন, কারণ “এই মুহূর্তে ইসরায়েল থেকে তাঁর কিছু পাওয়ার নেই।”
একই দিনে, থমাস ফ্রিডম্যান নিউ ইয়র্ক টাইমসে সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে লেখেন:
“এই ইসরায়েলি সরকার এমন আচরণ করছে যা যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থের জন্য হুমকি। নেতানিয়াহু আমাদের বন্ধু নন।” তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য হলো শান্তি নয়, বরং ওয়েস্ট ব্যাংক দখল, গাজার ফিলিস্তিনিদের উৎখাত এবং সেখানে ইসরায়েলি বসতি পুনঃস্থাপন।
এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কেবল রাজনৈতিক কারণ নয়, সামরিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখছে।
উদাহরণস্বরূপ, মে মাসের শুরুর দিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের আমেরিকান-প্রদত্ত থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে গিয়ে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে আঘাত হানে। এতে সব ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে ৩টি যুদ্ধবিমান ও ৭টি রিপার ড্রোন হারায় ইসরায়েল, যা মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
এসব সামরিক ও কূটনৈতিক বিপর্যয় ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক স্বার্থ ক্ষুন্ন করছে, এবং সেসব বোঝাতে এখন পশ্চিমা গণমাধ্যম নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ইসরায়েলের যুদ্ধ ও নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে ভাবছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে সানায় হুথি নেতৃত্বের সঙ্গে একপ্রকার সমঝোতা করেছে। ফলে হুথিদের মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ হলেও (লক্ষ্যবস্তু হিসাবে) একাকী রয়েছে ইসরায়েল।